মৃত ভেবে দেওয়া হয়েছিল কাঙালি ভোজ, ১৮ বছর পর জীবিত ফিরলেন আলমগীর
অমল তালুকদার, পাথরঘাটা (বরগুনা)
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
১৮ বছর আগে যে মানুষটি অভাবের তাড়নায় স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন, তাঁকে ঘিরে একসময় অপেক্ষা থেমে যায়। পরিবার ধরে নেয়, তিনি আর বেঁচে নেই। স্ত্রী নতুন সংসার গড়েছেন, অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছেন বাবা-মাও। এমনকি তাঁকে স্মরণ করে হয়েছে দোয়া মাহফিল ও কাঙালি ভোজ। সেই আলমগীর হাওলাদারই হঠাৎ বাড়ি ফিরে এসে যেন ১৮ বছরের সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছেন।
পাথরঘাটার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামে আলমগীরের বাড়ি। তাঁর বাবার নাম মৃত সিকান্দার আলী হাওলাদার।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে অভাবের তাড়নায় স্ত্রী আমেনা বেগম ও ছোট মেয়ে খাদিজাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান আলমগীর। সেখানে তিনি শ্রমিকের কাজ করতেন। স্ত্রী আমেনা কাজ করতেন একটি গার্মেন্টসে। সংসারের চাকা সচল রাখতে দুজনই ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু সেই ব্যস্ত জীবনের মাঝেই নেমে আসে এক নির্মম অন্ধকার।
আলমগীরের ভাষ্য, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসের কোনো একদিন ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাঁকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। গাড়িতে ওঠানোর পর তাঁর হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত একটি স্থানে, উঁচু দেয়ালঘেরা একটি প্রতিষ্ঠানে।
আলমগীর দাবি করেন, সেখানে তাঁর মতো আরও প্রায় ৩০ জন মানুষ ছিলেন। তাঁদের দিয়ে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কিন্তু কোনো বেতন, ভাতা কিংবা কোনো ধরনের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। পর্যাপ্ত খাবারও মিলত না। ভালো খাবার বলতে মাঝে মাঝে পাতলা ডাল আর আলু ভর্তাই ছিল তাঁদের ভরসা। এভাবেই অন্ধকার জীবনের ১৮টি বছর কেটে যায় তাঁর।
এদিকে দীর্ঘদিন খোঁজ করেও আলমগীরের সন্ধান না পেয়ে তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। একমাত্র মেয়ে খাদিজা বাবার অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে ঝির কাজ করে বড় হতে থাকেন। একসময় তাঁরও বিয়ে হয়ে যায়। কোথায় তাঁর বিয়ে হয়েছে, সেটিও জানেন না আলমগীর।
ছেলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পাঁচ বছর আগে মারা যান আলমগীরের বাবা-মা। ছেলের ফিরে আসার খবর তাঁরা আর শুনতে পারেননি। বর্তমানে আলমগীরের সংসারে রয়েছেন শুধু এক ভাই। তিনিও নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। দীর্ঘ নির্যাতন ও মানসিক আঘাতের পর গ্রামের বাড়িতে ফিরে আলমগীর বেশির ভাগ সময় নীরব থাকছেন। তাঁকে দেখে মনে হয়, ১৮ বছরের অন্ধকার সময় তাঁর স্বাভাবিক জীবনের অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে।
সদ্য বাড়ি ফেরা আলমগীরের ভাষ্য, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে তাঁকে সহ ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। সকালে তাঁরা যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে চলে যান। আলমগীরের পকেটে কোনো টাকা না থাকায় রাস্তায় ঘুরতে থাকা এক ব্যক্তি তাঁকে এক দিনের জন্য বালুর জাহাজে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজের সুযোগ করে দেন। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকমে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।
২৯ জুলাই বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ফিরে পেয়ে অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কীভাবে ছাড়া পেলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর দাবি করেন, সরকার পরিবর্তনের পর সম্ভবত অপহরণকারীরা নিজেদের বাঁচাতে ভয় পেয়ে তাঁদের ছেড়ে দিয়েছে।
আলমগীরকে মৃত ভেবে তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং মসজিদে দোয়ার আয়োজন করেছিলেন। এমনকি তাঁর স্মরণে কাঙালি ভোজেরও আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বিএনপির সাবেক উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান সাহেদ জানান, প্রায় ১৮ বছর আলমগীর নিখোঁজ ছিলেন। তাঁকে মৃত ভেবে বিভিন্ন সময় দোয়া মাহফিলের আয়োজনও করা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি বাড়ি ফিরে আসায় সবাই খুশি হয়েছেন। আলমগীর দাবি করছেন, তাঁকে আটকে রেখে জোরপূর্বক পরিশ্রমের কাজ করানো হয়েছিল।
সাহেদ আরও জানান, বাড়ি ফেরার পর আলমগীরকে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে ৩১ জুলাই শুক্রবার তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
দেড় যুগ ধরে হারিয়ে থাকা একজন মানুষ। তাঁকে মৃত ভেবে শেষ হয়ে গিয়েছিল অপেক্ষা। স্ত্রী গড়েছেন নতুন সংসার, বাবা-মা চলে গেছেন না-ফেরার দেশে, মেয়েরও হয়েছে বিয়ে। সেই মানুষটিই ১৮ বছর পর ফিরে এসে দাঁড়িয়েছেন নিজের বাড়ির উঠানে। আলমগীরের ফিরে আসার গল্প তাই যেন বাস্তবের চেয়েও অবিশ্বাস্য কোনো সিনেমার কাহিনি।
