পাকিস্তান এড়িয়ে চীনের আকাশপথে ভারত, সামনে যত চ্যালেঞ্জ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী ভারতীয় উড়োজাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উড়ানের সময়, জ্বালানি খরচ ও পরিচালন ব্যয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে এবার চীনের আকাশসীমা ব্যবহার করে বিকল্প রুট চালুর চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
ভারতের প্রস্তাবিত বিকল্প রুটটি চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় সিনকিয়াং অঞ্চলের হোটান হয়ে যাওয়ার কথা। এ বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাম মোহন নাইডু। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হোটান রুট নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
তবে এখনো এ রুট চালুর বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। কবে থেকে রুটটি চালু হতে পারে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল পেহেলগামে হামলার পর ভারতীয় নিবন্ধিত ও পরিচালিত উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তান। এর ছয় দিন পর ভারতও পাকিস্তানি উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। এরপর থেকে ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকাগামী উড়োজাহাজগুলোকে পাকিস্তানের আকাশপথ এড়িয়ে দীর্ঘ পথে চলতে হচ্ছে।
বর্তমানে এসব ফ্লাইটকে আরব সাগরের ওপর দিয়ে ওমানের দিকে গিয়ে পরে পশ্চিমমুখী হতে হচ্ছে। রুটভেদে এতে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে। ফলে জ্বালানি ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। পাকিস্তান সর্বশেষ ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা নোটিশে ভারতীয় উড়োজাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
প্রস্তাবিত হোটান রুট চালু হলে দিল্লি বা মুম্বাই থেকে উড়োজাহাজ উত্তর দিকে লেহের দিকে যেতে পারে। এরপর চীনের আকাশসীমায় ঢুকে হোটানের কাছ দিয়ে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে কিরগিজস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সেখান থেকে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকাগামী বিদ্যমান উড়ানপথের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই রুট তুলনামূলক সরাসরি হওয়ায় উড়ানের সময় ও জ্বালানি খরচ কমতে পারে। বিশেষ করে জর্জিয়া, বাকু, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ইউরোপের গন্তব্যে সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া। সাবেক এয়ার ইন্ডিয়া প্রধান ক্যাম্পবেল উইলসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় এক বছরে সংস্থাটির ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার কোটি রুপি হয়েছিল।
তবে হোটান রুট চালু করা সহজ হবে না। প্রস্তাবিত আকাশপথটি দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য এলাকার ওপর দিয়ে যাবে। লেহ থেকে হোটানের দিকে যেতে হলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত লাদাখ ও চীন-নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিনের মধ্যবর্তী উচ্চভূমির ওপর দিয়ে উড়তে হবে। ওই এলাকায় প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত রয়েছে।
এ পথে জরুরি অবতরণের ব্যবস্থাও একটি বড় বিষয়। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় উড়োজাহাজে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা কেবিনের চাপজনিত সমস্যা হলে দ্রুত নিচে নামার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজের জন্য জরুরি অবতরণের উপযোগী বিমানবন্দর সীমিত। ফলে নতুন রুট চালুর আগে নিরাপদ বিকল্প অবতরণস্থল ও পরিচালন পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।
এর সঙ্গে রয়েছে কৌশলগত ও সামরিক সংবেদনশীলতা। প্রস্তাবিত আকাশপথ চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় সামরিক কাঠামোর আওতাধীন এলাকার ওপর দিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে লাদাখ ও আকসাই চিন নিয়ে ভারত-চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। ফলে বেসামরিক উড়োজাহাজের জন্য এ আকাশপথ ব্যবহারে চীনের অনুমোদন ও দুই দেশের মধ্যে আকাশপথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এতসব জটিলতা থাকলেও হোটান রুট নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করছে। তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি এবং রুটটি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে ভারতও কোনো সময়সীমা দেয়নি।
এর মধ্যে ভারত-চীন সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক ২০২৫ সালের তুলনায় ভালো এবং ২০২৪ সালের তুলনায়ও উন্নত অবস্থায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল উড়ানপথের বিকল্প হিসেবে হোটান রুটকে বিবেচনা করছে ভারত। তবে দুর্গম পার্বত্য ভূখণ্ড, সীমিত জরুরি অবতরণ সুবিধা, সামরিক সংবেদনশীলতা এবং ভারত-চীনের সীমান্ত বিরোধের কারণে রুটটি বাস্তবায়নে কূটনৈতিক ও কারিগরি—দুই ধরনের সমন্বয়ই প্রয়োজন হবে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
