×

বরিশাল

নরম-গরম ছানার জাদু, চরফ্যাশনের মিষ্টির গল্প

Icon

এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন (ভোলা)

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

নরম-গরম ছানার জাদু, চরফ্যাশনের মিষ্টির গল্প

ছবি: সংগৃহীত

নরম-গরম ছানা দিয়ে তৈরি, যা মুখে দিলেই মিশে যায় দুধের ঘ্রাণ আর মিষ্টির মোলায়েম স্বাদ- বলছিলাম ভোলার চরফ্যাশনের বিখ্যাত ছানার রসমালাইয়ের কথা।

রসমালাইয়ের পাশাপাশি এখানকার রসগোল্লা, রসমঞ্জুরী, সরমালাই ও গুড়ের মিষ্টির সুনাম এখন ভোলা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

রসমালাই-রসগোল্লার পাশাপাশি চরফ্যাশনের মিষ্টির দোকানগুলোতে পাওয়া যায়- লালমোহন, কালোজাম, বেবি সুইট, মাদ্রাজি, লাল চমচম, কাঁচা ছানা, ছানার সন্দেশ, ছানার স্পঞ্জ, টক দই ও মিষ্টি দইসহ নানা ধরনের দুগ্ধজাত খাবার। স্থানীয়দের কাছে এসব মিষ্টি শুধু খাবার নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ।

চরফ্যাশনের যেকোনো সামাজিক বা পারিবারিক আয়োজন যেন মিষ্টি ছাড়া অসম্পূর্ণ। বিয়ে, বৌভাত, জন্মদিন কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে অতিথিরা সঙ্গে করে নিয়ে যান রসমালাই, রসগোল্লা কিংবা ছানার মিষ্টি। ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও পাঠানো হয় এসব মিষ্টি।

বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে রাজভোগ কিংবা রসগোল্লার স্বাদ নিতে প্রতিদিনই বিভিন্ন দোকানে ভিড় করেন ক্রেতারা। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ছানার তৈরি মিষ্টির প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।


চরফ্যাশনের মিষ্টির বিশেষত্বের অন্যতম কারণ হলো—এগুলো তৈরি হয় খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে। ফলে এর স্বাদ ও মানের দিক থেকে অন্য এলাকার সাধারণ মিষ্টির তুলনায় এখানকার রসগোল্লা ও রসমালাইয়ের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

চরফ্যাশনের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে রয়েছে হাজারো গরু-মহিষ। অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তুলেছেন গবাদিপশুর খামার। এসব খামার ও স্থানীয় গোয়ালাদের কাছ থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুধ সংগ্রহ করে মিষ্টির কারখানাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়। কারিগররা সেই দুধ থেকেই তৈরি করেন ছানা। 

স্থানীয় কারিগরদের হিসাবে, এক মণ দুধ থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কেজি ছানা পাওয়া যায়। এরপর দক্ষ কারিগরদের হাতে সেই ছানা রূপ নেয় রসগোল্লা, রসমালাই, সরমালাইসহ নানা ধরনের মিষ্টিতে।

চরফ্যাশন উপজেলার প্রায় প্রতিটি হাটবাজারেই রয়েছে মিষ্টির দোকান। শুধু পৌরসভার সদর এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০টি মিষ্টির দোকান। এসব দোকান ঘিরে গড়ে উঠেছে দুধ উৎপাদনকারী, গোয়ালা, কারিগর, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অর্থনৈতিক বলয়।

সদর এলাকায় উৎসব মিষ্টি ভাণ্ডার, রস মিঠাই, সাতক্ষীরা দধি ও মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, মিষ্টিমুখ, ভাই ভাই রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড সুইটস, নিরালা রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড সুইটস, ক্রেজি ফুড অ্যান্ড সুইটস এবং আল ফুড অ্যান্ড সুইটসসহ বেশ কয়েকটি পরিচিত মিষ্টির প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আল ফুড অ্যান্ড সুইটসের মালিক নাজিম উদ্দীন জানান, তার দোকানে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ মণ রসগোল্লা বিক্রি হয়।

তিনি বলেন, চরাঞ্চলের সবুজ ঘাস খাওয়া গরুর দুধ গোয়ালারা কারখানায় দিয়ে যান। সেই দুধ থেকেই তৈরি হয় খাঁটি ছানা। বর্তমানে ছানার স্পঞ্জ প্রতি কেজি ৪২০ টাকা, রসগোল্লা ৩৩০ টাকা, রসমালাই ৪৮০ টাকা, টক দই ২০০ টাকা, মিষ্টি দই ৩০০ টাকা এবং কাঁচা ছানা ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

নাজিম উদ্দীনের নিজের জীবনও এই মিষ্টির ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ছোটবেলায় পাঁচ ভাই ও দুই বোনের সংসারে বড় হয়েছেন তিনি। অভাবের কারণে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে নারায়ণগঞ্জের একটি বড় মিষ্টির কারখানায় কাজ শেখেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে এসে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার আয় দিয়ে পৌরসভা এলাকায় জমি কিনে বাড়িও করেছেন। তার ভাষায়, ‘সবমিলিয়ে ভালোই চলছে।’

এদিকে, চরফ্যাশনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরিতে এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু হয়েছে।

ভাই ভাই রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড সুইটসের মালিক শিরাজ মিয়া জানান, তাদের কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির মেশিন ব্যবহার করে মিষ্টি গোলাকার করা, ছানা কাটা ও অন্যান্য কাজ করা হয়।

তার হিসাবে, প্রতি মণ দুধ থেকে ১০ টাকা দামের প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০টি এবং ২০ টাকা দামের প্রায় ১৮০টি মিষ্টি তৈরি করা যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিভিন্ন দামের প্রায় ১০ মণ মিষ্টি বিক্রি হয়।

শিরাজ মিয়া বলেন, মিষ্টির ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই তাঁরা একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁর দোকানে কারিগর ও শ্রমিকসহ প্রায় ২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। রসমালাই ও দইয়ের স্বাদ নিতে অনেক ক্রেতাই বারবার তাঁর দোকানে ফিরে আসেন।

প্রায় ৩০ বছর ধরে মিষ্টি তৈরির সঙ্গে যুক্ত কামাল হাওলাদার জানালেন, চরাঞ্চল ও বিভিন্ন খামার থেকে প্রতিদিন কারখানায় দুধ আসে। এরপর নির্দিষ্ট পাত্রে কিছু সময় রেখে সেই দুধ বড় বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। নানা প্রক্রিয়ার পর তৈরি হয় ছানা।

তৈরি ছানা পরিষ্কার কাপড়ে তুলে ঝুলিয়ে পানি ঝরানো হয়। পরে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ছানাকে প্রস্তুত করা হয় মিষ্টি তৈরির জন্য। দক্ষ কারিগররা হাতে নিয়ে ছানাকে বিভিন্ন ওজন ও আকৃতিতে ভাগ করে গোলাকার করেন।

অন্যদিকে বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয় চিনির সিরা। সিরা প্রস্তুত হলে একে একে গোলাকার ছানাগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় তাতে। নির্দিষ্ট সময় সেদ্ধ হওয়ার পর মিষ্টিগুলো তুলে পাতলা সিরার পাত্রে রাখা হয়। এভাবেই তৈরি হয় চরফ্যাশনের সুস্বাদু ছানার রসগোল্লা।

সাতক্ষীরা মিষ্টি ও দধিঘরের মালিক রামঘোষ জানান, তাঁরা দুই ভাই প্রায় ৩০ বছর ধরে চরফ্যাশনে ব্যবসা করছেন। দোকানের নামের সঙ্গে সাতক্ষীরার পরিচয় থাকলেও এখন চরফ্যাশনের মিষ্টির ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি জড়িয়ে গেছে।


রামঘোষের মতে, এ অঞ্চলে প্রচুর গরু-মহিষ থাকায় তুলনামূলক সুলভ মূল্যে পর্যাপ্ত দুধ পাওয়া যায়। সেই দুধের মানসম্মত ছানা থেকেই তৈরি হয় সুস্বাদু মিষ্টি।

চরফ্যাশন একটি পর্যটন এলাকা উল্লেখ করে তিনি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের এখানকার মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার আহ্বান জানান।

মিষ্টির কারখানাগুলো শুধু রসনা তৃপ্তির ব্যবস্থা করছে না, একই সঙ্গে তৈরি করছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

সাতক্ষীরা মিষ্টি ও দধিঘরে কর্মরত সুধাংশু রঞ্জন বলেন, চরফ্যাশনে অন্তত ২০টি মিষ্টির কারখানায় বিভিন্ন শ্রেণির শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অনেক পরিবার স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছে।

স্থানীয়ভাবে দুধ উৎপাদনকারী ও গোয়ালা থেকে শুরু করে মিষ্টির কারিগর, পরিবহন শ্রমিক, দোকানকর্মী—বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

মিষ্টি ক্রেতা লোকমান হোসেনের কাছে চরফ্যাশনের রসগোল্লা ও রসমালাইয়ের স্বাদই আলাদা।

তিনি বলেন, খাঁটি ছানার রসগোল্লা, রসমালাই ও সরমালাইয়ের স্বাদ চরফ্যাশনে আলাদাভাবে পাওয়া যায়। ভোলা জেলার ঐতিহ্যের সঙ্গে এই মিষ্টি দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে। খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এর স্বাদ একবার খেলে সহজে ভোলা যায় না।

চরফ্যাশন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতারুল আলম শামু বলেন, মিষ্টি ও দইয়ের জন্য ভোলা জেলার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। চরফ্যাশনের খাঁটি ছানায় তৈরি মিষ্টি সেই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এ মিষ্টি ভোলার ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, মিষ্টি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

চরফ্যাশনের চরাঞ্চলের সবুজ ঘাস খাওয়া গরু-মহিষের দুধ, স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্য—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে এখানকার ছানার মিষ্টির আলাদা পরিচয়। তাই চরফ্যাশনে গেলে প্রকৃতি ও পর্যটন স্পট ঘোরার পাশাপাশি একবার হলেও স্বাদ নেওয়া যায় খাঁটি ছানার রসমালাই, রসগোল্লা ও সরমালাইয়ের।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

৯ বাংলাদেশির মরদেহ আসছে কাল

সৌদিতে কারখানায় আগুন ৯ বাংলাদেশির মরদেহ আসছে কাল

কারাগারে বিদিশা সিদ্দিক

প্রতারণা মামলা কারাগারে বিদিশা সিদ্দিক

হজ কার্যক্রমে অনুমতি পেলো আরও ৩৮ এজেন্সি

হজ কার্যক্রমে অনুমতি পেলো আরও ৩৮ এজেন্সি

মার্কিন ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত, কারণ জানাল পররাষ্ট্র দপ্তর

মার্কিন ভিসা সাক্ষাৎকার স্থগিত, কারণ জানাল পররাষ্ট্র দপ্তর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App