ভিডিও ভাইরাল
দেড় দশক ধরে চাঁদাবাজি চলছে মেঘনার নৌপথে
মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার নৌপথে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চাঁদাবাজির একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও সেই অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
গতকাল শনিবার (১৬ মে) দুপুরে উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের নলচর এলাকার নদীপথে একটি বাল্কহেড থামিয়ে কয়েকজন যুবক চাঁদা আদায় করেন। পরে ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ভিডিওটি নজরে আসার পর নলচর এলাকার এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোববার সকালে এই প্রতিবেদকের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তায় অভিযুক্তদের নাম জানান।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তারা হলেন—নলচর গ্রামের মজিদ মাস্টারের নাতি ও মো. সবুজ মিয়ার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (২৩), দিলি মিয়ার ছেলে নবীর হোসেন (২৬) এবং আতস আলীর ছেলে রুবেল মিয়া (৩০)।
নদীঘেঁষা গ্রামগুলোর স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, চাঁদাবাজির এই চিত্র কেবল চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো উপজেলার বিভিন্ন শাখা নদীপথ জুড়েই এটি বিস্তৃত। বিশেষ করে মুগারচর, কাঁঠালিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের রুটগুলোতে নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে তারা জানায়। এসব পথে চলাচলকারী বাল্কহেড চালকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, সুনামগঞ্জ থেকে দাউদকান্দি যাওয়ার পথে প্রতিবারই চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। কাঁঠালিয়া নদীপথে এই চাঁদার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর মধ্যে মুগারচর বা কাঁঠালিয়া ব্রিজের নিচ দিয়ে পারাপারের সময় বাধ্যতামূলকভাবে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও ভয়ভীতির কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। ফলে চাঁদাবাজি একটি নিয়মিত ব্যবসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। কারণ প্রশাসনের নীরবতা কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাধু কর্মকর্তাদের পরোক্ষ মদদ ছাড়া এত বড় পরিসরে চাঁদাবাজি পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন নৌপথে চলাচলকারী নৌযান থেকে পথে পথে অর্থ আদায় করা হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না।
প্রশাসন আন্তরিক হলে এ ধরনের চাঁদাবাজি সহজেই বন্ধ করা সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় নৌপথ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, যার সরাসরি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নৌযান চালক ও ব্যবসায়ীরা। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যাতে নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে পরিচালিত হতে পারে। অন্যথায় চলমান এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নৌপথভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে চালিভাঙ্গা নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আজমগীর হোসাইন বলেন, "এখনো পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে কেউ অভিযোগ দিলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।"
