আড়াই বছর ধরে শিক্ষকের স্বামীর মোবাইলে শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা
বাদল আহাম্মদ খান, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা আড়াই বছর ধরে শ্রেণিশিক্ষকের স্বামীর মোবাইল নম্বরে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ওই শিক্ষার্থীর বাবা একজন ভ্যানচালক।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আত্মসাৎ করা টাকার একটি অংশ শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইল নম্বরে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিসকে অবহিত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে উপবৃত্তির জন্য মনোনীত হয় রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী পরশ মিয়া। তবে উপবৃত্তির জন্য পরশের পরিবারের কোনো সদস্যের মোবাইল নম্বর ব্যবহার না করে সে সময়ের শ্রেণিশিক্ষক আয়েশা আক্তার তাঁর স্বামী ইব্রাহিম খলিলের মোবাইল নম্বর প্রদান করেন। এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর উপবৃত্তির টাকা ওই নম্বরে জমা হতে থাকে। আড়াই বছরে ওই নম্বরে মোট ৪ হাজার ৫০০ টাকা জমা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিষয়টি সামনে আসে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী পরশের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে কথা বলতে শ্রেণিশিক্ষক স্বীকৃতি রায় ক্লাস চলাকালে পরশের মা খুকি বেগমকে বিদ্যালয়ে ডাকেন। এ সময় তাঁকে জানানো হয়, নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন খুকি বেগম জানান, তাঁর ছেলে কখনোই উপবৃত্তির টাকা পায়নি।
বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানানো হলে তিনি উপবৃত্তির তালিকায় থাকা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তালিকায় থাকা নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, সেটি পরশের পরিবারের কারও নয়। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, নম্বরটি বর্তমানে অন্য বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে থাকা সাবেক শ্রেণিশিক্ষক আয়েশা আক্তারের স্বামী, চট্টগ্রামে কর্মরত ইব্রাহিম খলিলের।
প্রথমে শ্রেণিশিক্ষক ওই নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে প্রধান শিক্ষক একাধিকবার ফোন করলেও ইব্রাহিম খলিল ফোন রিসিভ করেননি। তবে অন্য এক শিক্ষক ফোন করলে তিনি কল রিসিভ করে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন। এরপর পরশের মা-ও ওই নম্বরে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানান। পরে বিকেলের দিকে ২ হাজার ৭০০ টাকা ফেরত পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, আড়াই বছরে ওই পরিমাণ টাকাই পাওয়া গেছে।
শ্রেণিশিক্ষক স্বীকৃতি রায় বলেন, “পরশ উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে না শুনে আমি অবাক হই। পরে দেখি অন্য একজনের মোবাইল নম্বর দেওয়া রয়েছে। যোগাযোগ করে জানতে পারি, সেটি ইব্রাহিম খলিল নামে একজনের নম্বর। এরপর বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানাই।”
পরশের মা খুকি বেগম বলেন, “আমি শ্রেণিশিক্ষককে জানাই, আমার ছেলে কোনো উপবৃত্তি পায় না। তখন আমাকে বলা হয় অন্য একজনের মোবাইল নম্বরে টাকা যাচ্ছে। আমি ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়, এমনকি রাগও দেখানো হয়। পরে ২ হাজার ৭০০ টাকা পাঠিয়ে আমাকে জানানো হয়। আমি বলেছি, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৌসুমী আক্তার বলেন, “একসময় যে কারও মোবাইল নম্বর দিলেই সেখানে উপবৃত্তির টাকা পাঠানো যেত। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্য নম্বর দেওয়া হয়েছে। ফোন নম্বরটি আমাদের সাবেক এক সহকর্মীর স্বামীর বলে অনেকে জানিয়েছেন। বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে ইব্রাহিম খলিলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিকবার তাঁর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিষয়টি জানাজানির পর থেকে তিনি ফোন এড়িয়ে চলছেন বলে জানা গেছে।
সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা দেখভাল করেন। যদি কোনো শিক্ষক প্রতারণা করে থাকেন, তাহলে এর দায় তাকেই নিতে হবে।”
