অর্থের অভাবে দেশে ফিরছে না সৌদিপ্রবাসীর মরদেহ
মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বৃদ্ধ বয়সে আর সংসারের ভার বইতে পারছেন না মো. কবির হোসেন। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে জীবিকার তাগিদে একমাত্র ছেলে মো. সাইফুল ইসলামকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। আশা ছিল, ছেলে উপার্জন করে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু প্রবাস জীবনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় স্ট্রোকে মারা যান সাইফুল। মৃত্যুর এক মাস পেরিয়ে গেলেও অর্থ ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার জটিলতায় এখনো দেশে আনা সম্ভব হয়নি তার মরদেহ।
সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্যম তালবাড়িয়া গ্রামের মো. কবির হোসেনের ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবের তায়েফে যান সাইফুল ইসলাম। সেখানে তিনি একটি ছাগলের খামারে কাজ করতেন। গত ১৯ জুন রাতে ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক করে তার মৃত্যু হয়। একই দিন বিকেলে পরিবার মৃত্যুর খবর পায়। এরপর দেশে থেকে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠানো হলেও এখনো মরদেহ দেশে আনার কার্যকর কোনো উদ্যোগ হয়নি। বর্তমানে তার মরদেহ সৌদি আরবে পুলিশ হেফাজতে হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
‘ভাইকে শেষবারের মতো দেখতে চাই’
সাইফুল ইসলামের বোন আসমা আক্তার বলেন, “গত ২০ জানুয়ারি আমার ভাইকে তার শ্বশুর মো. ইউনুস সৌদি আরব নিয়ে যান। যাওয়ার পর কয়েকবার আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। হঠাৎ ১৯ জুন খবর পাই, ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে সে মারা গেছে। এরপর ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র দূতাবাসে পাঠিয়েছি। কিন্তু দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, মরদেহ দেশে আনতে হলে একজন বৈধ প্রবাসীকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমার ভাইয়ের শ্বশুরের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি দায়িত্ব নিতে পারছেন না। এছাড়া মরদেহ দেশে পাঠানোর বিমান ভাড়ার টাকাও নেই।”
তিনি আরো বলেন, “সাইফুল আমার একমাত্র ভাই। তাকে শেষবারের মতো দেখতে চাই। প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি ভাইদের কাছে অনুরোধ, আমার ভাইয়ের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে দিন।”
‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম’
সাইফুলের বাবা মো. কবির হোসেন বলেন, “আমি কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। বয়স হয়ে গেছে, আর পারছি না। তাই ধারদেনা করে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলাম। আশা ছিল, ছেলে উপার্জন করে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এখন তার মরদেহও দেশে আনতে পারছি না। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের কাছে আমার আকুতি, যেন আমার ছেলের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।”
স্ত্রীর আহাজারি
জানা গেছে, চার বছর আগে বিয়ে করেন সাইফুল ইসলাম। তবে তাদের কোনো সন্তান হয়নি। তার স্ত্রী রিয়া মনি বর্তমানে বাবার বাড়িতে থাকেন।
রিয়া মনি বলেন, “আমার স্বামী মারা যাওয়ার আগে মোবাইলে আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ঘুমিয়ে পড়বেন। সকালে কাজে যাওয়ার জন্য ডাকাডাকির পরও তিনি না উঠলে দেখা যায় তিনি মারা গেছেন। দুপুরে আমরা খবর পাই। এরপর মালিকের সঙ্গে মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু এক-দুই দিন পর তিনি আর ফোন ধরেননি। এখন কীভাবে আমার স্বামীর মরদেহ দেশে আসবে বুঝতে পারছি না। প্রবাসে থাকা ভাইদের কাছে অনুরোধ, আমার স্বামীর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিন।”
‘শুধু একবার ছেলেটাকে দেখতে চাই’
ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছেন মা জাহানারা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি কিছু চাই না। শুধু আমার ছেলেটাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই। যেভাবেই হোক, আমার ছেলেকে বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করে দিন।”
এলাকার বাসিন্দা ও সমাজকর্মী মেজবাউল আলম বলেন, “কবির ভাই অনেক কষ্ট করে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছেন। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই তার মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। মৃত্যুর এক মাস পার হলেও এখনো মরদেহ দেশে আনা যায়নি। সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন সাইফুলের মরদেহ দেশে পাঠাতে সহযোগিতা করেন।”
মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না, কেউ অবহিত করেননি। প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখছি, সাইফুল ইসলামের মরদেহ দেশে আনার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়।”
