থানচিতে জুম চাষে কড়াকড়ি, পাহাড়ি সড়ক রক্ষায় পদক্ষেপ
উপজেলা প্রতিনিধি, থানচি (বান্দরবান)
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বর্ষা মৌসুম এলেই বান্দরবানের থানচি-আলীকদম-লিকড়ি সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং জরুরি সেবাগ্রহীতারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের ঢালে জুম চাষের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া এবং মাটির উপরিভাগ নষ্ট করাই এই ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ।
এ পরিস্থিতিতে থানচি উপজেলার সীমান্ত সড়ক (থানচি-লিকড়ি সড়ক)-এর উভয় পাশের ঢালে জুম চাষের জন্য গাছ কাটা, আগুন দেওয়া বা পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে—এমন সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়কের উভয় পাশের ঢালে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া, মাটির উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন কোনো কাজ করা যাবে না। এই নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরো পড়ুন: দল ভারী করতে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত নয়
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষায় অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢালের মাটি আলগা হয়ে সড়কের ওপর ধসে পড়ে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো একাধিক দিন যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এতে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৃক্ষ ও ঘাসের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। কিন্তু জুম চাষের প্রস্তুতির সময় এসব গাছপালা কেটে আগুনে পুড়িয়ে ফেললে মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়, যা ভারী বৃষ্টিতে সহজেই ধসে পড়ে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, "সীমান্ত সড়কটি কেবল একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটি এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পাহাড় কেটে বা গাছ পুড়িয়ে জুমের জমি প্রস্তুত করলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই জনস্বার্থে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কারবারি, হেডম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো বলেন, পাহাড় রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবিকা হলেও, সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে ঢালের গাছ কেটে আগুন দিলে তা পুরো এলাকার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পর্দ্দা মৌজার হেডম্যান হাবরু ম্রো জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প পদ্ধতিতে চাষাবাদের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সচেতনতামূলক প্রচারণা, নিয়মিত নজরদারি ও আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দেন।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, পাহাড় শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বন, জীববৈচিত্র্য, পানি সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার মূল ভিত্তি। পাহাড়ের ঢাল রক্ষা করা গেলে ভূমিধস কমবে এবং সড়ক টেকসই থাকবে। প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, জুমচাষি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে থানচি-লিকড়ি, থানচি-বান্দরবান ও থানচি-আলীকদম সড়ক নিরাপদ রাখতে।
