প্রাণ গেছে ৩৪ জনের
৩০ বছরেও থামেনি মানুষ-হাতির রক্তক্ষয়ী সংঘাত
খোরশেদ আলম, শেরপুর
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
তিন দশকেও থামেনি শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ১৯৯৬ সালের দিকে শুরু হওয়া এ সংকট এখনো তাড়া করে ফিরছে সীমান্তের পাহাড়ি জনপদকে। একের পর এক সভা-সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। বসানো হয়েছে সোলার ফেন্সিং, গঠন করা হয়েছে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি), করা হয়েছে হাতির খাদ্য উপযোগী বৃক্ষরোপণ। কিন্তু বাস্তবে কমেনি সংঘাত। বরং হাতির হানা, ফসলহানি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ গেছে ৩৪ জনের। একই সময়ে মারা গেছে ৩১টি হাতি। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব হাতির বেশির ভাগই মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে। অর্থাৎ তিন দশকের নানা উদ্যোগের পরও মানুষ ও হাতি—দুই পক্ষই যেন সংঘাতের বলি হচ্ছে।
প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এ সংকট সবচেয়ে তীব্র। সন্ধ্যা নামলেই খাবারের সন্ধানে গভীর অরণ্য থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল। ধান, শাকসবজি, কলাগাছ, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছ নষ্ট করে। গোলার ধান-চাল খেয়ে ও পায়ে মাড়িয়ে ক্ষতি করে। ভেঙে ফেলে কাঁচা ঘরবাড়ি। ফলে সন্ধ্যার পর আতঙ্ক নেমে আসে সীমান্তের গ্রামগুলোতে।

হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে ফসল ফলাতে চান না। ঝুঁকি নিয়ে চাষ করলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই হাতির পাল হানা দিয়ে তা নষ্ট করে দেয়। সামনে ধানের মৌসুমে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্প আছে, সুফল নেই
সংঘাত নিরসনে ২০১৪ সালে তাওয়াকোচা ও বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ এলাকায় হাতির খাদ্যের জন্য বাঁশ, কলাগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পর এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা এখন নেই বললেই চলে।
একই সময়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয় সোলার ফেন্সিং। স্থাপনের পর দীর্ঘদিন ধরে সেটিও অকেজো পড়ে আছে বলে অভিযোগ। কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের এমন পরিণতিতে প্রশ্ন উঠেছে, পরিকল্পনা ও অর্থব্যয়ের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এত ফারাক কেন?
হাতির আক্রমণ থেকে মানুষকে সতর্ক করতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গঠন করা হয়েছে ১০টি ইআরটি। প্রতিটি দলে রয়েছেন ১০ জন সদস্য। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলে ঝুঁকি নিয়ে গ্রামবাসীকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
হাতি তাড়ানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। মাঝে মধ্যে জেলা পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে টর্চলাইট বিতরণ করা হলেও দুর্গম ও দরিদ্র হাতিকবলিত এলাকার অনেক মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
-6ab15e281d097.jpeg)
বন দখল, সংকটের আরেক কারণ
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন বিভাগের জমি প্রায় ২১ হাজার একর। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার একর বেদখলে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বেদখল জমির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার একর। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে শত শত ঘরবাড়ি; চলছে চাষাবাদ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাতির জন্য স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই বনভূমি দখলমুক্ত করতে হবে। বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল নিরাপদ করতে হবে। তা না হলে সংঘাত কমানো কঠিন।
তিন দশক পর ‘অভয়ারণ্য’ ভাবনা
দীর্ঘ ৩০ বছর পর এবার গারো পাহাড়ে বন্যহাতির জন্য অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে শেরপুর জেলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আয়োজনে দিনব্যাপী সেমিনারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল। এতে বন বিভাগের কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, পুলিশ, বিজিবি, ইআরটি সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
-6ab15e38809b6.jpeg)
সেমিনারে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, মানুষের নিরাপত্তা, ফসল ও বসতবাড়ি রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘ ৩০ বছর পর অভয়ারণ্য ও খাদ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—তিন দশক ধরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, একের পর এক প্রকল্প ও সভা-সেমিনারের পরও যদি মানুষ-হাতির সংঘাত থামানো না যায়, তাহলে এতদিনের উদ্যোগের সুফল গেল কোথায়?
তাঁদের মতে, এবার আর কাগুজে পরিকল্পনা নয়; প্রয়োজন বাস্তবায়ন। হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল চিহ্নিত করে নিরাপদ অভয়ারণ্য ও পর্যাপ্ত খাদ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কার্যকর ক্ষতিপূরণ এবং সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।
তিন দশকের ব্যর্থতার পর এবার অভয়ারণ্য তৈরির সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কাগজে থাকবে, নাকি সত্যিই বদলাবে গারো পাহাড়ের মানুষের ভাগ্য—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
