জুলাই বিপ্লবে শহীদদের স্মরণে ‘মেহফিল-ই ইনকিলাব’
জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৭ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
একটা সময় ছিল যখন মুক্তমঞ্চে প্রোগ্রাম মানেই যেন মাদকের আখড়া এমন শিরোনামে নিউজ করতে হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিভিন্ন পোর্টাল-পত্রিকার সাংবাদিকদের। সময় বদলেছে, নতুন হাওয়া লেগেছে আজ জাহাঙ্গীরনগরসহ এদেশের বুকে। শরতের এই দমকা হওয়া যেন নতুন বাংলাদেশের সূচনার ইঙ্গিত। তা না হলে আজ এই হাওয়ায় কেন আতরের ঘ্রাণ, কেন গোলাপের সুবাস? বলছিলাম মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত কাওয়ালি সন্ধ্যার কথা। যে কাওয়ালি মুক্তমঞ্চকে দিয়েছে এক বিপ্লবী বাংলাদেশের ঠিকানা। জুলাই-বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ অনুষ্ঠিত হলো ‘মেহফিল-ই ইনকিলাব’ নামে কাওয়ালি সন্ধ্যা।
‘জুলাই বিপ্লব-২০২৪’ এর সকল শহীদদের স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিপ্লবী গান, আবৃত্তি ও কাওয়ালি গানের আসরটি আয়োজন করেছে ‘বিপ্লবী সাংস্কৃতিক মঞ্চ।’ ‘মেহফিল-ই ইনকলাব’ শীর্ষক এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি দেখতে শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয় এখানে উপস্থিত হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল শুক্রবার (৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই ভিড় জমে তে থাকে সেলিম আল-দীন মুক্তমঞ্চে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে ভিড় তত বাড়ছে এই যখন অবস্থা তখন মুক্তমঞ্চে উঠেছেন সঞ্চালক সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম। মাইক হাতে নিতেই দর্শক শাড়ি থেকে আনন্দের উচ্ছ্বাস যেন অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হলো অনুষ্ঠান। সকলে দাঁড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধাভরে একসাথে গাইলো সেই সংগীত। ইতিমধ্যে মুক্তমঞ্চে তিল ঠাঁই আর না রে, কানায় কানায় ভরে উঠে। এসময় কাওয়ালি গানের পাশাপাশি বিপ্লবী গান, নজরুল সংগীত, নাতে রাসূলসহ বিভিন্ন ধরনের আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠান।
আয়োজনের শুরুতেই পারফর্ম করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পীরা। তাদের কণ্ঠে ‘ধন-ধান্য পুষ্পে ভরা,আমাদেরই বসুন্ধরা’ যেন দাগ কেটে যায় দর্শকদের। একই সাথে সুড় মিলিয়ে মুক্তমঞ্চ গেয়ে উঠে সেই গান, সাথে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট। আহ সে কি দৃশ্য! একে একে তারা পরিবেশন করে সামি ইউসুফের গান ‘মাওলা ইয়া সাল্লিও ওয়া সাল্লিম দায়িমান আবাদান’, ‘ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনায়’,‘আমি পাপী তিনি জামিনদার’ সহ আরো কয়েকটি সংগীত। তাদের পারফর্ম শেষ হলে স্টেজে বিপ্লবী কবিতা আবৃত্তি ও বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি হয়। এরপর ‘প্যালেস্টাইন’ এর স্বাধীনতা কামনা করে স্লোগান দিতেও দেখা যায় এই অনুষ্ঠানে। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে প্যালেস্টাইন এর পতাকা উত্তোলন করতে দেখা যায়। একদিন ইসারায়েলি দখলদারত্বের হাত থেকে প্যালেস্টাইন মুক্ত হবে এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স শেষ হলে মঞ্চে আসে আমন্ত্রিত ব্যান্ড। ‘বিপ্লবী সাংস্কৃতিক মঞ্চে’র শিল্পীদের সাথে এবার দর্শক মাতিয়েছেন ঢাকার ‘ওয়ান এম্পায়ার’ টিম। একে একে বাদ্যযন্ত্র আর শিল্পীদের গায়কীতে এক মোহনীয় মূর্ছনার সৃষ্টি হয়। কাওয়ালি গানের আধ্যাত্মিকতা ও বিপ্লবী গানের সুরে মেলবন্ধনে দর্শকেরা জুলাই বিপ্লবের শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন৷ কাওয়ালি গানের সুরে মুক্তমঞ্চে এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর সাবেক- বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় অনুষ্ঠানটি। প্রতিটি কোণায় ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। এ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসানসহ বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মিকদাদ বলেন, ’২৪ এর জুলাই মাসের এ আন্দোলনে আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের এক মাস পূর্তিতে এমন একটা আয়োজন আমাদের খুব আবেগাপ্লুত করেছে৷ শহীদদের রক্তমাখা স্মৃতিকে ধারণ করে আমরা বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে পারব এটাই প্রত্যাশা করি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম ভুঁইয়া বলেন, মুক্তমঞ্চে এটাই আমার প্রথম প্রোগ্রাম দেখা। ’২৪ এর জুলাই বিপ্লবে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই কাওয়ালির সন্ধ্যা দেখার জন্য মনকে কোনোভাবেই আটকাতে পারি নাই। শহীদরা আমাদেরকে যেভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ এনে দিয়েছে তাদের স্মরণে এই অনুষ্ঠান আমাকে সেই বিপ্লবের কথা মনে করে দিয়েছে। তাদের স্মৃতি ভোলার নয়, জুলাই-বিপ্লব ভোলার নয়। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে আমাদেরকে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে।
মেহফিলে-ই ইনকিলাবের আয়োজক আহসান লাবিব বলেন, ’জুলাই বিপ্লবের শহিদদের স্মরণে বিপ্লবী মঞ্চের আয়োজনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে সারা বাংলাদেশে নতুন করে সাংস্কৃতিক ধারা শুরু হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে তা ছিল অসম্ভব। অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে বেরিয়ে এসে সুস্থ সংস্কৃতির এমন সুন্দর আয়োজন সর্বমহলে সাড়া ফেলেছে। মানুষ আমাদের এ আয়োজনকে সাদরে গ্রহণ করেছে। আমরা এমন একটি ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এমন সুস্থ সংস্কৃতির আয়োজন ও অংশগ্রহণ করতে পারে।'
কাওয়ালি সন্ধ্যা শেষ হয়েও যেন শেষ হলো না, রেশ রয়ে গেলো। অনুষ্ঠান শেষে বিদায় বেলায় এমন হাহাকার দেখা যাচ্ছিল দর্শকদের মাঝে। আবারও একদিন এরকম কাওয়ালির আয়োজন করবে এই মঞ্চ এমনটাই প্রত্যাশা করেছেন তারা। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় যেন ভরে যায় জাহাঙ্গীরনগরের প্রতিটি কর্নার। আতরের ঘ্রাণ আর গোলাপের সুবাস রেখেই তাই মুক্তমঞ্চ ছেড়েছে শিক্ষার্থীরা। ‘বিপ্লবী সাংস্কৃতিক মঞ্চ’কে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলো দর্শকেরা।
