হাওরাঞ্চলের নদ-নদী
মৃত্যুঘণ্টা বাজছে সুমেশ্বরী-সুরমা-কালনীসহ ১০৬ নদীর
রাসেল আহমদ, হাওরাঞ্চল ঘুরে এসে
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর দিয়ে প্রবাহিত আন্তরাষ্ট্রীয় নদী সুমেশ্বরী বছরের বেশিরভাগ সময়ই নাব্যতা সংকটে ভুগছে। গত শুকনো মৌসুমে তোলা। ছবি: ভোরের কাগজ
কোথাও যাতায়াতের অপরিকল্পিত সড়ক, কোথাও ফসল রক্ষা বাঁধ, আবার কোথাও ক্ষমতার দাপটে অবৈধ স্থাপনা ও রিয়েল এস্টেট- উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নামে নদী ও খালগুলোকে কার্যত 'হত্যা' করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১০৬টি নদী রয়েছে। এসব নদীর অধিকাংশই বছরের পর বছর ধরে পলি জমা, শিল্প ও প্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ দখল এবং নদীর তোয়াক্কা না করে নির্মিত ‘উন্নয়ন অবকাঠামো’ এখন হাওরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উজানের সামান্য পাহাড়ি ঢল ও বর্ষাকালে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী প্রলয়ংকরী বন্যা। একই সাথে নাব্যতা হারিয়ে মরে যাচ্ছে হাওরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ সুরমা, কালনী, পাটলাই, খাসিয়ামারা ও উথারিয়ার মতো ছোট-বড় শতাধিক নদ-নদী।
পরিবেশবিদ, কৃষিবিদ ও স্থানীদের মতে, প্রকৃতি ও নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে এই 'জোরপূর্বক উন্নয়ন' হাওরের সার্বিক ইকোসিস্টেম, অর্থনীতি, লোকসংস্কৃতি ও জনস্বাস্থ্যকে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাঁধের নামে নদী হত্যা: স্থায়ী জলজটে বন্দি হাওরজনপদ
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় বিস্তৃত দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে গোলাবাড়ি ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় পাটলাই নদীর সংযোগ খাল ও গাঙে বিশাল মাটি ও স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গুরমার হাওরের ফসল রক্ষার অজুহাত দেওয়া হলেও এই নদীর দক্ষিণ তীরে আলাদা বাঁধ ও পূর্বে নজরখালীতে স্থায়ী বাঁধ রয়েছে। ফলে পাটলাই নদীতে বাঁধ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না; উল্টো এর প্রভাবে নদীটি নাব্যতা হারিয়ে দুই দিকে বিশাল চর জেগে মৃত খালে পরিণত হয়েছে।
একই চিত্র শান্তিগঞ্জের উথারিয়া নদীতেও। একসময় উথারিয়া নদী হয়ে দেখার হাওরের উদ্বৃত্ত পানি মহাসিং নদীতে গিয়ে নামত। কিন্তু স্বাধীনতার পর উথারিয়া নদীর ধারা বড়দই বিলসংলগ্ন খালের সঙ্গে যুক্ত স্থানে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে নদীর প্র স্বাভাবিক মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সুরমা নদীর ওপর পাহাড়ি ঢলের একক ও মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বর্ষাকালে সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক ও দোয়ারাবাজারবাসীকে চরম প্রলয়ংকরী বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও কোটি কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো।
এছাড়া ২০১২ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের কালাগাঙ নদীতে বাঁধ দেওয়ার পর নদী দখল করে স্থায়ী দোকানপাট ও বাসাবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। একই উপজেলার মনাই ও সরমরা নদীও একইভাবে ভরাট হয়ে গেছে।
অকার্যকর কোটি টাকার রাবারড্যাম, শুকিয়ে যাচ্ছে খাসিয়ামারা
দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীর নাব্যতা সংকটে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে স্থানীয় কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা। ২০০৩ সালে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাবারড্যাম নির্মাণ করা হলেও নদীর উজানে পলি ও বালুর আস্তরণ জমে পুরো নদী ভরাট হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ শূন্যে নামায় রাবারড্যামটি এখন পুরোপুরি অকার্যকর।

টিলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আলতাব আলী ও কৃষক ফরিদ মিয়া আক্ষেপ করে জানান, প্রতি বছর সরকারিভাবে নদী থেকে বালু-পাথর লিজ দেওয়া হলেও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং না থাকায় ড্যামের ওপর দিয়ে নৌকা চলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় আগাম বন্যায় পুরো ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাস্টার বলেন, “খাসিয়ামারা নদীর রাবারড্যাম প্রকল্পটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। নদীর নাব্যতা ও কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুত পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।”
প্লাস্টিক দূষণে ‘মৃতপ্রায়’ বাউল সম্রাটের কালনী: ৬৫% মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গানে যে কালনী নদীর রূপ বর্ণিত হয়েছিল, তা আজ পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) গবেষকদের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক চিত্র- কালনী নদীর পানি ব্যবহারকারী তীরবর্তী এলাকার প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ নানাবিধ চর্মরোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন।
হাট-বাজার ও জনবসতি থেকে ফেলা টন টন প্লাস্টিক ও পলিথিন নদীতে কালক্রমে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকে’ পরিণত হচ্ছে, যা জলজ প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা বিনষ্ট হচ্ছে এবং ভাটি অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জীবিকা পঙ্গু হয়ে পড়ছে।
৪৩ বছরে ৪০ মিটার সরু সুরমা: হারিয়ে যাচ্ছে সিলেট অঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ
এদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রধান জীবনরেখা সুরমা নদী ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৪৩ বছরে সুরমা নদীর গড় প্রস্থ কমেছে প্রায় ৪০ মিটার! নদীতে পলি জমার হার নদীভাঙনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

উজান থেকে আসা পাহাড়ি পলি, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিক্ষেপ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং বেপরোয়া বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদী উপচে দেখা দিচ্ছে নজিরবিহীন বন্যা। পরিবেশবিদদের শঙ্কা- অবিলমে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সুরমা নদী অচিরেই একটি সরু নালায় পরিণত হবে।
হারিয়ে গেছে নৌপথ, ধ্বংসের মুখে জীববৈচিত্র্য
‘আমরা হাওরবাসী’ সংগঠনের তথ্য ও গবেষণা সমন্বয়কারী ফেরদৌস আলম বলেন, “একসময় আজমিরীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব ও নেত্রকোনা থেকে সরাসরি নদী ও খাল পথে সুনামগঞ্জে সহজে যাতায়াত করা যেত। স্বাধীনতার আগের সেই নৌপথ আজ নতুন প্রজন্মের কাছে কল্পনামাত্র।”
সুনামগঞ্জের 'হাওর বাঁচাও আন্দোলন এর সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, "অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো এখন হাওরের জন্য অভিশাপ। প্রকৃতি এই জোরপূর্বক উন্নয়ন মানছে না, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ষাকালে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জীববৈচিত্র্য।"
উন্নয়ন পরামর্শক ও 'অ্যাসোসিয়েটস ফর ইনোভেটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট'-এর পরিচালক আব্দুল হাই চৌধুরী জানান, অবৈধ দখল, পলি পড়া, অপরিকল্পিত বাঁধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ আঘাতেই পুরো হাওরাঞ্চলের জলধারা সংকটে পড়েছে।
বাঁধের বদলে ‘রাবার ড্যাম’ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী(২) মোঃ ইমদাদুল হক জানান, সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার ৫১টি নদী ও খালের প্রায় ১৯৮ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আশা করা যায়, ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে খননকাজ শুরু হবে। খনন করা গেলে বর্ষায় দ্রুত পানি নিষ্কাশন, বন্যার চাপ কমানো, বোরো ফসল রক্ষা, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে সুফল মিলতে পারে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকদের মতে, হাওরে মাটির স্থায়ী বাঁধ বা অপরিকল্পিত সড়কের বদলে বর্ষায় পানি প্রবাহ সচল রাখার মতো উড়াল সড়ক (এলিভেটেড রোড) এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখার জন্য প্রয়োজনভেদে পরিকল্পিত 'রাবার ড্যাম' নির্মাণ করা হলে নদী ও খালগুলো রক্ষা পাবে। একই সাথে বিশেষজ্ঞরা সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (সুবিপ্রবি) হাওরের নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গবেষণার কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, মধ্যনগরের সুমেশ্বরীসহ জেলার ২০টি নদী খননের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাশাপাশি নতুন করে ৫১টি নদী ও খালের প্রায় ১৯৮ কিলোমিটার পুনঃখননের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, শুধু ড্রেজিং দিয়ে হাওরের নদী বাঁচানো যাবে না। নদীর প্রবাহপথে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ ও দখল বন্ধ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি চলাচলবান্ধব সড়ক নির্মাণ এবং নদী-খাল-বিলকে একটি সমন্বিত জলপ্রবাহ হিসেবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
হাওরের নদীগুলো বিচ্ছিন্ন জলধারা নয়। সুরমা, কালনী, পাটলাই, খাসিয়ামারা, উথারিয়া কিংবা ছোট কোনো সংযোগ খাল- সবই একটি বৃহৎ জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ। তাই ৫১টি নদী-খাল পুনঃখননের ৩০০ কোটি টাকার উদ্যোগটি শুধু খনন প্রকল্প না হয়ে হাওরের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাসের সুযোগ হতে পারে।
নদী বাঁচাতে হলে শুধু পলি তুললেই হবে না; নদীর প্রবাহ, সংযোগ ও দখলমুক্ত তীরও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে একদিকে কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খনন হবে, অন্যদিকে একই নদীর মুখে বাঁধ, দখল ও দূষণ চলতে থাকবে। হাওর বাঁচানোর প্রথম শর্ত তাই তার নদীগুলোকে বাঁচানো।
হাওরাঞ্চলের নদ-নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন ড্রেজিং বা সাময়িক উদ্যোগ কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘সমন্বিত রিভার ম্যানেজমেন্ট সেল’ গঠন করা জরুরি।
জরুরি ভিত্তিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন
বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং ও উচ্ছেদ: সুরমা, কালনী ও খাসিয়ামারাসহ প্রধান নদীগুলোতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পলি অপসারণ ও তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি: নদী অববাহিকার হাট-বাজার ও শহরের জন্য কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং ইউনিট স্থাপন।
অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ: হাওরের পানি নিষ্কাশনের গতিপথ উন্মুক্ত করতে অপ্রয়োজনীয় ও স্থায়ী মাটির বাঁধ অপসারণ।
সামাজিক আন্দোলন: নদী তীরের মানুষকে সচেতন করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনকে নিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন কখনো প্রকৃতি ধ্বংস করে টেকসই হতে পারে না। নদী হারালে হাওরের কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ ধসে পড়বে এবং লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। তাই কালনী, সুরমা ও খাসিয়ামারার ক্রন্দন থামাতে রাষ্ট্রকে এখনই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
