আইটিএফসি থেকে ২.৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয় মেটাতে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এ অর্থায়ন নিয়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় ২১ থেকে ২৪ জুন অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক অর্থায়ন পরিকল্পনা সভায় বাংলাদেশ ও আইটিএফসির মধ্যে আলোচনা হবে। বৈঠকে চূড়ান্ত অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। তার সঙ্গে থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ।
ইআরডি সূত্র জানায়, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলার, পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানির জন্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সার আমদানির জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাইবে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে তাদের প্রয়োজন ছিল ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৭০০ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকায় আগামী অর্থবছরের জন্য তারা বেশি অর্থায়নের আবেদন করবে।
এছাড়া আইটিএফসির অর্থায়নে কেনা জ্বালানি এবং স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি কেনা জ্বালানির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়।
আরো পড়ুন : ‘রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া চার্জশিট নিয়ে প্রকাশিত তথ্য সিআইডির নয়’
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থিতিশীল অর্থনীতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং দেশীয় গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের কারণে অতিরিক্ত ঋণের প্রয়োজন কম ছিল। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশের।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অনুমোদিত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থায়ন ব্যবহার করতে চায় পেট্রোবাংলা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাতারএনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেড পার্টনারশিপসহ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। ফলে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা জুন ২০২৬-এ অন্তত দুটি এলএনজি কার্গো কেনার জন্য এই অর্থায়ন ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে।
ইআরডি সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিএডিসির জন্য আইটিএফসি ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলার নিশ্চিত এবং ৩০০ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা হিসেবে সংরক্ষিত ছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সার আমদানির জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে আইটিএফসি সাময়িকভাবে অর্থ ছাড় স্থগিত করেছে।
বিএডিসি জানিয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে প্রথম ধাপের ১০০ মিলিয়ন ডলার শুধু সৌদি আরব থেকে সার আমদানির জন্য নির্ধারিত থাকায় তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তাই ভবিষ্যৎ অর্থায়ন চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের শর্ত না রেখে বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে সার আমদানির সুযোগ চায় সংস্থাটি।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সফরকারী আইটিএফসি প্রতিনিধি দল দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আইটিএফসির মোট অর্থায়ন সীমা ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি চাহিদা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।
আইটিএফসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক আইটিএফসি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৭ সাল থেকে আইএসডিবি বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি তেল আমদানিতে অর্থায়ন শুরু করে সংস্থাটি। ২০০৮ সালের পর থেকে এই সহায়তা আইটিএফসির মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইটিএফসি প্রায় ২১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে।
বাংলাদেশ আবুধাবির এডিএনওসি থেকে মুরবান ক্রুড এবং সৌদি আরবের আরামকো থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আমদানি করে। এসব আমদানির অর্থ পরিশোধে অর্থায়ন দিয়ে থাকে আইটিএফসি।
এছাড়া এলএনজি আমদানির জন্য ২০২৪ সালে ১০০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী জেদ্দা বৈঠকে এই অর্থায়ন প্রস্তাবই হবে প্রধান আলোচ্য বিষয়।
