×

অর্থনীতি

ফিনটেকে এক দশকের নেতৃত্বে সৈয়দ তানভীর আহমেদ

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

ফিনটেকে এক দশকের নেতৃত্বে সৈয়দ তানভীর আহমেদ

ছবি : সংগৃহীত

ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁর কাজ ছিল ব্যবসা তৈরি করা। সময়ের সঙ্গে সেই দায়িত্ব বদলে হয়েছে বাজার তৈরি, দল গঠন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণ। এখন সেই অভিজ্ঞতার পরিধি আরও বড়—একাধিক ব্যবসায়িক ইউনিটের কৌশল ও পরিচালনার সমন্বয়।

সৈয়দ তানভীর আহমেদের পেশাগত যাত্রা গত এক দশকের কিছু বেশি সময়ে এমনভাবেই বিস্তৃত হয়েছে। অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষাজীবন শেষে আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা খাতে ব্যবসা উন্নয়ন, বিক্রয় নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ডিবি ইনভেস্টিংয়ের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার।

চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান ব্যবসা উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর প্রথম দিকের দায়িত্ব ছিল দল পুনর্গঠন, কার্যক্রমের সমস্যা চিহ্নিত করা, প্রতিযোগী ও বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা তৈরি করা। পরে দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়ে গ্রুপ পর্যায়ের ব্যবসা, কৌশল ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়।

তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি সরল ছিল না। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁকে এমন বাজার ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে, যেখানে নতুন করে কাঠামো তৈরি করার প্রয়োজন ছিল। কোথাও ব্যবসা পুনর্গঠন, কোথাও নতুন ব্র্যান্ডকে বাজারে প্রতিষ্ঠা, আবার কোথাও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি তৈরি—প্রতিটি অভিজ্ঞতাই তাঁর পরবর্তী দায়িত্বের জন্য নতুন পরিসর তৈরি করেছে।

সংকটের বাজারে নতুন শুরু

ব্যবসা যখন নিম্নমুখী, তখন প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকার পরামর্শই বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু ২০২২ সালে এমন এক সময়েই গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সে যোগ দেন তানভীর। তখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা নিম্নমুখী ছিল এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে ছিল।

সেই পরিস্থিতিতে তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু নতুন গ্রাহক আনা নয়; বরং একটি কার্যকর ব্যবসায়িক কাঠামো নতুন করে দাঁড় করানো। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, “সেই সময় পরিস্থিতি সহজ ছিল না। শুধু ব্যবসা বাড়ানোর চিন্তা করলে হতো না, পুরো কাঠামোকে নতুন করে ভাবতে হয়েছিল।

তাঁর দাবি অনুযায়ী, সাত মাসের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে ৩৫টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ১১৫টি খুচরা অংশীদারত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি স্থানীয় অর্থ লেনদেন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে লেনদেনের অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং কয়েকজন উচ্চ সম্পদশালী গ্রাহককে যুক্ত করার কাজও করা হয়।

গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সে আঞ্চলিক ব্যবসা উন্নয়ন ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময় একটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বাজারকে অংশীদারনির্ভর নেটওয়ার্কে পরিণত করাকেই তিনি নিজের বড় অবদান হিসেবে দেখেন।

তিনি  ভোরের কাগজ লাইভকে বলেন, “সেখানে আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি দুর্বল বাজারকে আবার কার্যকর করে তোলা। আমি শুধু বিক্রয় বাড়ানোর দিকে না গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরির দিকে গুরুত্ব দিয়েছি।”

দল ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত

গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সের পর দুবাইভিত্তিক গোল্ড মার্কেট কোম্পানি জারা এফএক্সে বিক্রয় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন তানভীর। এখানে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি তাঁর গুরুত্ব ছিল বিক্রয় দলের কাঠামো পুনর্গঠন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

তিনি বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সেটি টেকসই হয় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তথ্য ও বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাই দলের কাজের পদ্ধতিতেও সেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি।”

এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ওয়ানরয়্যালে জ্যেষ্ঠ ব্যবসা উন্নয়ন ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। পরের বছর নভেম্বরে পান আঞ্চলিক দেশ ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব। তখন ওয়ানরয়্যাল খুচরা বাজারে তুলনামূলক নতুন একটি ব্র্যান্ড। ফলে নতুন অঞ্চলে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন অঞ্চল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে ভিন্ন নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ও গ্রাহকের আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে।

তিনি ভোরের কাগজ লাইভকে বলেন, “প্রতিটি বাজারের বাস্তবতা এক নয়। একটি অঞ্চলে যে কৌশল কাজ করে, অন্য অঞ্চলে সেটি একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল নিয়েছি।”

এই সময়ে তিনি সীমাহীন অদলবদল সুবিধা চালু করেন এবং চারটি অঞ্চলে ওয়ানরয়্যালের উপস্থিতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি শক্তিশালী ব্যবসা উন্নয়ন দল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য ছিল শুধু দ্রুত প্রবৃদ্ধি নয়, ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। একটি ভালো দল তৈরি না হলে কোনো ব্যবসার প্রবৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয়।”

ডিবি ইনভেস্টিংয়ে বড় পরিসরের দায়িত্ব

২০২৬ সালের এপ্রিলে ডিবি ইনভেস্টিংয়ে প্রধান ব্যবসা উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন তানভীর। নতুন প্রতিষ্ঠানে প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার ছিল সংগঠনকে ভেতর থেকে বোঝা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।

তিনি বলেন, “প্রথম ১০০ দিনে আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে গভীরভাবে বোঝা। কোথায় সমস্যা, কোথায় সম্ভাবনা এবং কোন জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন—এসব চিহ্নিত করাই ছিল প্রথম কাজ।”

এ সময় দল পুনর্বিন্যাস, চলমান কার্যক্রমের সমস্যা চিহ্নিত করা, কর্মদক্ষতার ঘাটতি থাকা জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের শক্তি-দুর্বলতা, সুযোগ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি বার্ষিক বাজেট ও প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়।

এরপর তাঁর দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়। গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে এখন একাধিক ব্যবসায়িক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পদবি নয়, কী তৈরি করেছেন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ

নিজের ক্যারিয়ারের তিনটি সিদ্ধান্তকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তানভীর—গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সে যোগ দেওয়া, জারা এফএক্স থেকে ওয়ানরয়্যালে ফিরে যাওয়া এবং ডিবি ইনভেস্টিংয়ে যোগ দেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই সাংগঠনিক পরিবর্তন শুরু করা।

তিনি বলেন, “কখনো কখনো পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়। তাই শুরুতেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

ক্যারিয়ারের সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি পদবি বা ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে কী তৈরি করেছেন, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, “আমার কাছে শুধু পদবি গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি কোনো প্রতিষ্ঠানে কী তৈরি করে যেতে পেরেছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি দল, একটি বাজার বা একটি ব্যবসায়িক কাঠামো—আমি কী পরিবর্তন রেখে যেতে পেরেছি, সেটিই আমার কাছে সাফল্যের মাপকাঠি।”

গ্লোবাল মার্কেট ইনডেক্সে দুর্বল বাজারকে অংশীদারনির্ভর নেটওয়ার্কে রূপ দেওয়া, জারা এফএক্সে দল ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তৈরি এবং ওয়ানরয়্যালে নতুন ব্র্যান্ডকে একাধিক অঞ্চলে সম্প্রসারণ—প্রতিটি ধাপেই নতুন কিছু তৈরির অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর।

এক দশকের কিছু বেশি সময়ে তাঁর কাজের পরিধি তাই ক্লায়েন্ট থেকে বাজার, বাজার থেকে প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রুপ পর্যায়ের কৌশল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এখন তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বিভিন্ন দল ও ইউনিট একই কৌশলগত লক্ষ্যের দিকে কাজ করতে পারে।

প্রতিটি ধাপে পদবি বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে; কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে—যে জায়গায় গেছেন, সেখানে নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা।

তাঁর পথচলার সারকথাও যেন সেখানেই। তানভীরের ভাষায়, “শুরুটা কোথা থেকে, সেটি নয়; আপনি প্রতিটি জায়গায় কী তৈরি করছেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই আপনার পরিচয় হয়ে ওঠে।”

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১৯ দিনে এলো ২২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স

১৯ দিনে এলো ২২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল

পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ কত?

পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ কত?

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুল ও প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুল ও প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App