মেঘের আড়াল ছাপিয়ে যে রোদের উচ্ছ্বাস
আনিস রহমান
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম
হাবিব ওয়াহিদ ও তার ছোট বোন শম্পা করিম। ছবি: সংগৃহীত
"মেঘের কোলে রোদ হেসেছে
বাদল গেছে টুটি,
আজ আমাদের ছুটি ওভাই
আজ আমাদের ছুটি।"
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চিরন্তন কবিতার মধ্যে এতোকাল শুধু প্রকৃতিকেই দেখেছি। দেখেছি প্রকৃতির অনাবিল আনন্দ ও উচ্ছলতাকে। অবশ্যি তার আগে মেঘের আড়াল ছাপিয়ে যে রোদের উচ্ছ্বাস, তার প্রকাশ ঘটে তা কখনও ভেবে দেখিনি সেভাবে।
আসলে মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ। এবং অবিচ্ছেদ্য সে সম্পর্ক। তাই বুঝি প্রকৃতি মানুষেরই এক জীবন ভাষ্য। তা না হলে জীবনের পালাবদল কেমন করে রূপায়িত হয় প্রকৃতির কোলে। কিংবা জীবনের দ্রষ্টব্যগুলো বদলে যায় প্রকৃতির মতোই ---- রোদ বৃষ্টির খেলাচ্ছলে!
তা না হলে যেখানে দুদিন বাদে জন্মদিনের আলোহাওয়া একটু একটু করে আঁকিবুঁকি করছিল হাওয়ার সঙ্গে দোল খেতে খেতে। তখন বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ আকাশজুড়ে মেঘর ঘনঘটা। কালো মেঘ। জমাটি তার রূপ। কিন্তু সে রূপ যে এতো তড়িঘড়ি এতোটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে তা কে জানতো!
বলছিলাম ছোট কাগজ সম্পাদক হাবিব ওয়াহিদ প্রসঙ্গে। যাকে আমরা শিবলী নামেই চিনি। গত ২৯ আগস্ট শিবলীর ছোট বোন শম্পা করিম মারা যান। ওদিকে ৩১ আগস্ট ছিল হাবিব ওয়াহিদ শিবলীর জন্মদিন। অনুঘটকের মতো একদিকে রোদ আর মেঘ, অন্যদিকে স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের উঁকিঝুঁকি। স্বপ্ন --- দুদিন বাদে শম্পা নেপাল যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন শম্পা। এবার সেই জটিলতা থেকে মুক্ত হবার সুযোগ এসেছে। তাই নেপাল যাওয়ার আগ মুহূর্তে সাংসারিক গোছগাছ থেকে শুরু করে তার চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যক্তিগত প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত তখন শম্পা। তবে শিবলীর মাথায় ওর জন্মদিন নিয়ে কী ভাবনা কাজ করছিল জানি না, তবে শম্পার চিকিৎসা , তার নেপাল ভ্রমণ, নিজের জন্মদিন এবং 'অনিন্দ্য'---- সব মিলেমিশে তখন একাকার ওর মস্তিষ্কে। নস্টালজিয়া তখন নানাভাবে আঁকড়ে ধরেছে শিবলীকে।

বিশেষ করে শিবলী- শম্পা এবং অনিন্দ্য তখন একই সূত্রে গাঁথা। কারণ অনিন্দ্য নামটি শম্পারই দেয়া। সেই শম্পা এখন অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য বাইরে যাচ্ছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে। তখন নিজের জন্মদিনে অনিন্দ্য সম্পাদক হিশেবে শম্পার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক শুভাশিস প্রকাশের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা আর্তি ছিল কি? এ নিয়ে তখন শিবলী ওর হৃদয়ের গভীরে কোনো ছক আঁকছিল কি! হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না।
তবে শিবলীর দীর্ঘশ্বাস থেকে তেমনটিই আঁচ করা যায়।
কারণ শম্পা যখন পরম মমতা নিয়ে ওর নানা প্রয়োজনীয় কাপড় ভাঁজ করছিল তখনই হঠাৎ ওর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত আঘাত। কদিন জমে-মানুষের টানাটানির পর যখন শম্পার শরীর মোটামুটি স্ট্যাবল। সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে মাত্র, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে হৃৎপিণ্ড থেমে যায় শম্পার। ও এখন কাঠের চৌকো ফ্রেমে বন্দী।
শিবলী বেদনাভেজা কন্ঠে জানালো,অনিন্দ্য নামটি শম্পারই দেয়া। চার দশকেরও বেশি সময় আগে ও এ নামটি দিয়েছিল ও। সেই থেকে সুখেদুখে সবসময় অনিন্দ্যর সঙ্গে জড়িয়েছিল শম্পা। আজকের অনেক তুখোড় লেখকের হাতেখড়ি হয়েছিল একদিন অনিন্দ্যেই।
তাঁদের অনেকেই আজ লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাই এদের সম্পর্কে প্রায়ই খোঁজখবর নিত শম্পা। এখন কে কোথায় আছে কী করছে সেসব জানতে অনেক সময় আগ্রহ দেখাতো শম্পা। ওর কি কো গোপন ইচ্ছে ছিল সুস্থ হয়ে ফিরলে অনিন্দ্যর পুরনো ও আজকের সকল লেখককে একসঙ্গে জড়ো করে এক ফ্রেমে ছবি তুলে রাখবে। আড্ডা হবে দিনভর। আলাপচারিতা হবে। এমনি আরও কতো কী! কিন্তু সব স্বপ্নকে আকাশে ছড়িয়ে দিয়ে শম্পা হারিয়ে গেল অনন্তলোকে।
এ পর্যায়ে শিবলীর যন্ত্রণা প্রকাশ পায় এভাবেই ----
১.অনিন্দ্যর সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল আমার বোন শম্পা। ও নেই, আর অনিন্দ্য বের করে কী হবে!
২.সবাইকে একসঙ্গে জড়ো করার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত শম্পা অধরাই রেখে গেল। শম্পার আমন্ত্রণে যদি পুরনো দিনের লেখকরা সেভাবে সাড়া না দিত,তবে কী শম্পা খুব বেশি কষ্ট পেত! খুব বেশি নাড়া খেতো ওর বিশ্বাসের ঘরে!
এসব যখন ভাবি তখন কেন যেন মনে হয়--- শম্পার মুখ রক্ষা হলো।
একমুঠো দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে এ কথাগুলো বেরিয়ে এলো
শিবলীর বুক চিরে!!
লেখক: কথা সাহিত্যিক
