বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ফুটবলার কারা
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
ফাইল ছবি
বিশ্বকাপে নামের ওজন আর বাজারমূল্যের হিসাব সব সময় এক নয়। লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখনও এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর দুটি নাম। কিন্তু বাজারমূল্যের তালিকায় তাদের যুগ অনেকটাই পেছনে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের তালিকা দেখাচ্ছে, ফুটবলের অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র এখন নতুন প্রজন্মের হাতে।
ট্রান্সফারমার্কটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান দুজন লামিনে ইয়ামাল ও আর্লিং হলান্ড। দুজনেরই বাজারমূল্য ২০০ মিলিয়ন ইউরো। একজন স্পেনের ১৮ বছর বয়সি বিস্ময়বালক, অন্যজন নরওয়ের গোলমেশিন। তাদের পরেই আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, যাঁর বাজারমূল্য ১৮০ মিলিয়ন ইউরো।
এই তালিকাই বলে দিচ্ছে বিশ্ব ফুটবল কোন দিকে যাচ্ছে। একসময় বাজারমূল্যের আলোচনায় মেসি, রোনালদো, নেইমার, হ্যাজার্ড, বেলদের নাম ছিল সামনে। এখন সেই জায়গা নিয়েছেন ইয়ামাল, হলান্ড, এমবাপ্পে, পেদ্রি, ওলিসে, ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস, ভিনিসিয়ুস, বেলিংহাম, সাকা, মুসিয়ালা ও ভির্ৎসরা।
শীর্ষে ইয়ামাল ও হলান্ড
লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে স্পেনের প্রত্যাশা অনেক। বয়স মাত্র ১৮, কিন্তু বাজারমূল্যে তিনি বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের একজন। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছেন। ড্রিবলিং, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বাঁ পায়ে ভেতরে ঢোকা, আর বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিণত ফুটবল—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে বিশ্বকাপেও উত্তেজনা বিশাল।
হলান্ডের গল্প আলাদা। নরওয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বকাপে ফিরেছে, আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। ক্লাব ফুটবলে গোলের পর গোল করা হলান্ডের সামনে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। ২০০ মিলিয়ন ইউরোর বাজারমূল্য তার গোল করার ক্ষমতারই প্রতিফলন।
ইয়ামাল ও হলান্ডের মধ্যে পার্থক্যও আকর্ষণীয়। ইয়ামাল সৃষ্টিশীলতা, গতি ও বিস্ময়ের প্রতীক। হলান্ড নির্মম ফিনিশিং ও শারীরিক আধিপত্যের প্রতীক। দুজন দুই ধরনের ফুটবলারের প্রতিনিধিত্ব করছেন, কিন্তু দুজনই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এমবাপ্পে এখনও প্রজন্মের মুখ
কিলিয়ান এমবাপ্পে বাজারমূল্যে তৃতীয় হলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তার গুরুত্ব অন্য মাত্রার। ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছেন, ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেছেন, গোল্ডেন বুট জিতেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি শুধু ফ্রান্সের সেরা খেলোয়াড় নন, টুর্নামেন্টেরও অন্যতম মুখ।
১৮০ মিলিয়ন ইউরোর বাজারমূল্য এমবাপ্পের জন্য কোনো বিস্ময় নয়। তিনি গোল করেন, গোল বানান, বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেন। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে তার অভিজ্ঞতা ইয়ামাল বা হলান্ডের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বাজারমূল্যের তালিকায় তিনি তৃতীয় হলেও প্রভাবের হিসাবে এমবাপ্পে এখনো এক নম্বর আলোচনার অংশ।
স্পেনের তরুণ শক্তি
পেদ্রি ১৫০ মিলিয়ন ইউরো বাজারমূল্য নিয়ে শীর্ষ পাঁচে। ইয়ামালের সঙ্গে পেদ্রির উপস্থিতি দেখায়, স্পেনের নতুন প্রজন্ম কতটা শক্তিশালী। পেদ্রি হয়তো গোলের জন্য আলোচনায় থাকেন না, কিন্তু খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, চাপের মধ্যেও বল ধরে রাখা, ছোট জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব জায়গায় তিনি স্পেনের হৃৎপিণ্ড।
স্পেনের জন্য বড় শক্তি হলো বাজারমূল্যের এই তারুণ্য শুধু নামের তালিকায় নেই, মাঠের কাঠামোতেও আছে। ইয়ামাল ও পেদ্রিদের প্রজন্ম স্পেনকে আবার বল দখল, দ্রুত পাস ও আক্রমণের গতির যুগে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
ফ্রান্সের গভীরতা ভয়ংকর
মাইকেল ওলিসে ১৫০ মিলিয়ন ইউরো বাজারমূল্য নিয়ে তালিকার শীর্ষ পাঁচে আছেন। এমবাপ্পের সঙ্গে ওলিসে, দেজিরে দুয়ে, উসমান দেম্বেলে, উইলিয়াম সালিবা—সব মিলিয়ে ফ্রান্সের স্কোয়াড শুধু তারকা-নির্ভর নয়, গভীরতাতেও ভয়ংকর।
ফ্রান্সের সুবিধা এখানেই। এমবাপ্পে না জ্বললেও অন্য কেউ জ্বলে উঠতে পারে। ওলিসের মতো খেলোয়াড় ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে শট নিতে পারেন, পাস দিতে পারেন, সেট পিসেও ভূমিকা রাখতে পারেন। দুয়ে তরুণ, সালিবা রক্ষণে বিশ্বমানের, দেম্বেলে অভিজ্ঞ। বাজারমূল্যের তালিকা ফ্রান্সের বেঞ্চশক্তি ও বিকল্পের ছবিও দেখায়।
ব্রাজিলের ভরসা ভিনিসিয়ুস
ব্রাজিলের সবচেয়ে দামি মুখ ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তার বাজারমূল্য ১৪০ মিলিয়ন ইউরো। নেইমার না থাকায় ব্রাজিলের আক্রমণের বড় দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোল করে তিনি সেটাই দেখিয়েছেন।
ভিনিসিয়ুস শুধু বাজারমূল্যের খেলোয়াড় নন, ম্যাচ বদলে দেওয়া খেলোয়াড়। গতি, এক-দুইয়ে বেরিয়ে যাওয়া, একের বিপক্ষে এক লড়াই জেতা—এই গুণগুলো তাকে বিশ্বকাপের যে কোনো ম্যাচে বিপজ্জনক করে তোলে। ব্রাজিল যদি দূর যেতে চায়, ভিনিসিয়ুসকে শুধু ঝলক নয়, ধারাবাহিক নেতৃত্বও দিতে হবে।
ইংল্যান্ডের সোনালি মূল্য
জুড বেলিংহাম ১৩০ মিলিয়ন ইউরো, ডেক্লান রাইস ১২০ মিলিয়ন ইউরো, বুকায়ো সাকা ১১০ মিলিয়ন ইউরো—ইংল্যান্ডের বাজারমূল্যের শক্তি স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের স্কোয়াড অনেক দিন ধরেই ‘দামি কিন্তু অপূর্ণ’ তকমা নিয়ে এগিয়েছে। এবার প্রশ্ন—এই বাজারমূল্য কি ট্রফিতে রূপ নিতে পারবে?
বেলিংহাম ইংল্যান্ডের আক্রমণাত্মক মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় নাম। রাইস মাঝমাঠের ভারসাম্য, সাকা ডান দিকের ধার। এই তিনজনের ওপর ইংল্যান্ডের সাফল্যের অনেকটা নির্ভর করবে। বাজারমূল্য তাদের সম্ভাবনা দেখায়, কিন্তু বিশ্বকাপ তাদের মানসিক শক্তির পরীক্ষা নেবে।
জার্মানির নতুন মুখ
জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্ৎস দুজনেরই বাজারমূল্য ১০০ মিলিয়ন ইউরো। জার্মানি কুরাসাওর বিপক্ষে ৭-১ জয়ে যে আক্রমণাত্মক শক্তি দেখিয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিল এই তরুণ সৃজনশীলতা। মুসিয়ালা বক্সের ভেতর ঢুকে গোল করতে পারেন, ভির্ৎস লাইন ভেঙে পাস দিতে পারেন।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের হতাশার পর জার্মানি নতুনভাবে নিজেদের গড়ছে। মুসিয়ালা-ভির্ৎসদের মূল্য শুধু অর্থে নয়, ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবেও বড়। এই প্রজন্ম জার্মানিকে আবার ভয়ংকর করে তুলতে পারে।
১০০ মিলিয়ন ইউরোর ক্লাব
এই বিশ্বকাপে ১০০ মিলিয়ন ইউরো বা তার বেশি বাজারমূল্যের ফুটবলারদের তালিকা দীর্ঘ। ময়েসেস কাইসেদো, হুলিয়ান আলভারেস, উসমান দেম্বেলে, উইলিয়াম সালিবা—সবাই এই ক্লাবে। কাইসেদো ইকুয়েডরের মাঝমাঠের প্রাণ, আলভারেস আর্জেন্টিনার আক্রমণের বিকল্প শক্তি, সালিবা ফ্রান্সের রক্ষণের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান, দেম্বেলে অভিজ্ঞতা ও অনিশ্চয়তার মিশ্রণ।
এই তালিকার সৌন্দর্য হলো, সব তারকা একই ধরনের নয়। কেউ গোলদাতা, কেউ সৃষ্টিশীল, কেউ রক্ষণে নেতা, কেউ মাঝমাঠের ইঞ্জিন। বাজারমূল্য শুধু গোলের হিসাব নয়; বয়স, সম্ভাবনা, ক্লাব পারফরম্যান্স, চুক্তির অবস্থা, পজিশন, চাহিদা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়।
বাজারমূল্য কি বিশ্বকাপ জেতায়
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বাজারমূল্য কখনোই বিশ্বকাপ জেতার নিশ্চয়তা নয়। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ জিততে শুধু দামি ফুটবলার লাগে না; লাগে ভারসাম্য, ফিটনেস, কৌশল, মানসিকতা, গোলরক্ষক, সেট পিস, বেঞ্চের শক্তি এবং কখনো ভাগ্যও।
তবু এই তালিকা আমাদের একটি বড় গল্প বলে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মেসি-রোনালদোর শেষ অধ্যায়ের মঞ্চ নয়; এটি ইয়ামাল-হলান্ড-এমবাপ্পে-বেলিংহামদের প্রজন্মের বিশ্বকাপ। বাজারমূল্যের তালিকা সেই প্রজন্ম বদলের দলিল।
এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়রা শুধু নিজেদের দেশের আশা বহন করছেন না, বহন করছেন ফুটবলের ভবিষ্যৎও। কেউ প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন, কেউ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চান, কেউ পুরোনো ব্যর্থতা মুছতে চান।
তাই প্রশ্নটা শুধু কে সবচেয়ে দামি নয়। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল বাজারমূল্যের চাপ কে মাঠে প্রমাণ করতে পারবেন? উত্তর দেবে বিশ্বকাপের বাকি পথ।
