অপূর্ণ বিশ্বকাপ স্বপ্ন নিয়েই রোনালদোর বিদায়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ছবি : সংগৃহীত
অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়। অধরা রয়ে গেল তার বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হলেও সে বিতর্কে কখনোই জড়াননি পর্তুগিজ মহাতারকা। তবে বিশ্বকাপের শেষ প্রান্তে এসে দুজনের অর্জনের পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবু কিছু অনন্য রেকর্ড চিরকালই উজ্জ্বল হয়ে থাকবে রোনালদোর নামের পাশে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে অসংখ্য ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন তিনি। কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তুলেছেন নিজের অসাধারণ মানসিকতা ও গোল করার ক্ষমতায়। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং জুভেন্টা- এ ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটিয়েও যে শিরোপাটি তার নাগালের বাইরে ছিল, সেটি আর জেতা হলো না।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ষষ্ঠ ও শেষ বিশ্বকাপকে বিদায় জানান ৪১ বছর বয়সী রোনালদো। ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের করতালির মধ্যে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। এমন এক ক্যারিয়ার, যা ফুটবলে দীর্ঘস্থায়িত্বের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
পর্তুগালের সদ্য পদত্যাগী কোচ রবার্তো মার্টিনেজ রোনালদোকে ‘ফুটবলের আইকন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই বিশ্বকাপে তিনি যা করার চেষ্টা করেছেন, তার জন্য আমরা সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব। তার স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপ জেতা, আর অধিনায়ক হিসেবে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তিনি ফুটবলের একজন আইকন। রোনালদোর মতো মানুষ খুব বেশি নেই।
কেমন ছিল বিশ্বকাপে রোনালদোর পথচলা
বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শেষ হলো ২৭ ম্যাচে ১১ গোল নিয়ে। নকআউট পর্বে তার একমাত্র গোলটি এসেছে চলতি আসরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে, যা পর্তুগালের কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন টিকিয়ে রেখেছিল। এর আগে ২০০৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন তিনি। সেই আসরেই বিশ্বকাপে তার সর্বোচ্চ সাফল্য—চতুর্থ স্থান। সেবার পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি আসরে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে করা গোলটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে (৪১ বছর ১৪৭ দিন) কোনো ফুটবলারের গোল। পুরো বিশ্বকাপ ইতিহাসে বয়সের বিচারে এটি দ্বিতীয়, যেখানে সবার ওপরে রয়েছেন রজার মিলা।
২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। বিশেষ করে ৮৮তম মিনিটের সেই অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ গোল হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমি তার বড় একজন ভক্ত। তার মূল্যবোধ, খেলাটির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং পেশাদারিত্ব আমাকে সবসময় মুগ্ধ করেছে। তরুণদের জন্য তিনি একজন আদর্শ।’
মেসির সঙ্গে বিশ্বকাপে আর দেখা হলো না
ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো-লিওনেল মেসির লড়াই একটি পুরো প্রজন্মের ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের মুখোমুখি হওয়া আর হলো না।
এবার সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পর্তুগাল যদি গ্রুপে শীর্ষে শেষ করত এবং দুই দলই পরের ধাপগুলো পেরোতে পারত, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে রোনালদো-মেসি দ্বৈরথ দেখা যেত। কিন্তু সেই স্বপ্নও অপূর্ণই থেকে গেল।
মেসি ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন, পরে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। অন্যদিকে, রোনালদোর প্রতিটি বিশ্বকাপ অভিযানই শেষ হয়েছে হতাশায়। তার ১১ গোলের বিপরীতে মেসি চলতি আসরেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার (এখন পর্যন্ত ২০ গোল) আসনে পৌঁছে গেছেন।
ফুটবল রোনালদোকে প্রায় সবকিছুই দিয়েছে—অসংখ্য শিরোপা, ব্যক্তিগত সম্মাননা, গোলের রেকর্ড আর কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির বিপক্ষে একটি স্মরণীয় লড়াই—এই দুটি স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে গেল।
