ইসরায়েলের সঙ্গে যেভাবে জড়িয়ে গেল মেসির নাম
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও সম্মানজনক ক্যারিয়ারগুলোর একটি গড়ে তুলেছেন তিনি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী এই তারকা সবসময়ই জনসমক্ষে সংযত ভাবমূর্তি বজায় রেখেছেন। রাজনীতি নিয়ে খুব কমই মন্তব্য করেছেন এবং বড় কোনো জনবিতর্কেও সচরাচর জড়াননি।
তবে ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার মাঝে মাঝে ইহুদি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ইসরায়েলি কোম্পানির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আলোচনায় এসেছেন। আবার অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার সময় আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া এক বৃদ্ধা দাবি করেছিলেন, হামলাকারীদের কাছে মেসির নাম বলেই তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
চলতি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ ঘিরে ইসরায়েলবিরোধী কিছু গোষ্ঠী মেসির অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলছে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াই হলো জায়নবাদবিরোধী অবস্থান। অন্যদিকে অনেক ইসরায়েলিরা আর্জেন্টিনা ও মেসিকে সমর্থন দিয়েছেন।
ম্যাচের আগে ইসরায়েলি গণমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েল মেসির ক্যারিয়ারের এমন ১০টি ঘটনা তুলে ধরে, যেখানে তিনি বা তার জনপ্রিয়তা কোনো না কোনোভাবে ইহুদি ও ইসরায়েলি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ম্যাকাবিয়া গেমস
২০১৩ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত ম্যাকাবিয়া গেমসে অংশ নিতে যাওয়া আর্জেন্টিনার দলের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান মেসি। এই প্রতিযোগিতাকে অনেকেই ‘ইহুদিদের অলিম্পিক’ বলে থাকেন।
তবে এটিই প্রথম নয়। ২০১১ সালে তিনি ১৯৯৪ সালে বুয়েনস এইরেসে এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় নিহত ৮৫ জনের স্মরণে ন্যায়বিচারের দাবিতে পরিচালিত এক প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।
ওয়েস্টার্ন ওয়াল সফর
২০১৩ সালের আগস্টে তখনকার ক্লাব বার্সেলোনার সাথে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সফরে যান মেসি। সেখানে জেরুজালেমে ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ পরিদর্শন করে দেয়ালের ফাঁকে নিজের প্রার্থনাপত্র গুঁজে দেন তিনি।
ওই সফরে বার্সেলোনা ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি শিশুদের জন্য ফুটবল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। এছাড়া দলটি জেরুজালেমের তৎকালীন মেয়র নির বারকাত, প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
শান্তির ম্যাচ
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পোপ ফ্রান্সিসের উদ্যোগে রোমে আয়োজিত ‘ম্যাচ ফর পিস’-কে সমর্থন জানান মেসি। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা দিতে এই ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল।
চোটের কারণে তিনি খেলতে পারেননি। তবে দিয়েগো ম্যারাডোনা, ইসরায়েলের ইয়োসি বেনায়ুনসহ রাশিয়া, ক্যামেরুন, ইতালি, ফ্রান্স ও ব্রাজিলের তারকারা অংশ নেন।
অনাকাঙ্ক্ষিত দান
২০১৬ সালে মিশরের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নিজের ফুটবল বুট দান করার পর মিশরের কিছু কর্মকর্তা মেসিকে ‘ইহুদি’ ও ‘জায়নবাদী’ বলে সমালোচনা করেন।
মিশর ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন মুখপাত্র আজমি মোগাহেদ এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেন, আমি জানি সে ইহুদি। সে ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে, ওয়েইলিং ওয়াল পরিদর্শন করেছে। আমাদের তার জুতা দরকার নেই। মিশরের দরিদ্র মানুষেরও কোনো ইহুদি বা জায়নবাদী নাগরিকের সাহায্য প্রয়োজন নেই।’
বিডিএসের চাপে ম্যাচ বাতিল
২০১৮ সালের জুনে ইসরায়েলের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করে আর্জেন্টিনা। বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস (বিডিএস) আন্দোলনের চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সময় ‘আর্জেন্টিনা, যেও না’ (#ArgentinaNoVayas) স্লোগানে প্রচারণা চালানো হয়েছিল।
বুয়েনস এইরেসে ইসরায়েলি দূতাবাস জানায়, মেসির বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ায় তার সতীর্থদের সংহতির কারণেই ম্যাচটি বাতিল করা হয়।
জার্সি পোড়ানোর হুমকি
এর দুই মাস পর ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান জিবরিল রাজুবকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে ফিফা। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিফার পদক্ষেপ দাবি করে আসা রাজুব সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, মেসি বা আর্জেন্টিনা ইসরায়েলে খেলতে এলে তার ছবি ও জার্সি পুড়িয়ে ফেলতে।
তেলআবিবে প্রীতি ম্যাচ
২০১৯ সালে আর্জেন্টিনা ঘোষণা দেয়, তারা তেলআবিবে উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে। বিডিএস আন্দোলন আবারও এর বিরোধিতা করে। বার্সেলোনায় আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলন ক্যাম্পের বাইরে বিক্ষোভ হয় এবং মেসিকে ম্যাচে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ হাজার দর্শকে পূর্ণ ব্লুমফিল্ড স্টেডিয়ামে একটি গোল করেন মেসি। দর্শকদের মধ্যে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিনও উপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইয়ের (পিএসজি) হয়ে আরও দুবার ইসরায়েলে খেলেন মেসি। দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল ম্যাকাবি হাইফা।
ইসরায়েলি কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর
২০২০ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান অরক্যাম-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হন মেসি। তিন বছরের চুক্তিতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হন। এর আগেও ২০১৭ সালে তেলআবিবভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিরিন ল্যাবস-এর বৈশ্বিক দূত হিসেবে কাজ করেছিলেন।
প্রাণ বাঁচাতে মেসির নাম
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় ৯০ বছর বয়সী এসথার কুনিও নামের এক নারী দাবি করেন, হামলাকারীর সামনে মেসির নাম উল্লেখ করায় তিনি অপহরণ হওয়া থেকে রক্ষা পান। হামলার সময় তিনি বন্দুকধারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে ফুটবল পছন্দ করে কি না। এরপর ওই বৃদ্ধা বলেন, আমি মেসির দেশ থেকে এসেছি।
মেসির নাম শোনার পর ওই হামলাকারী তার সাথে ছবি তোলেন এবং তাকে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয়। পরে তিনি তার নাতিকে উদ্ধারে মেসির সহায়তাও কামনা করেন।
ইহুদি লবির অভিযোগ
গত মাসে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিক করেন মেসি। ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার এক টেলিভিশন বিশ্লেষক দাবি করেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি না দেওয়ার পেছনে ‘ইহুদি লবি’ কাজ করেছে।
বিশ্লেষক মুস্তাফা মাজ্জুজি বলেন, মেসিকে ইহুদি লবি রক্ষা করছে। এই লবি পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে। তারা মাফিয়ার মতো সবকিছু পরিচালনা করে। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো চান না আমরা ভালো করি। পশ্চিম সাহারা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তারা আমাদের সফল হতে দিতে চায় না।
এদিকে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি অনুসারী থাকা এক ফিলিস্তিনি টিকটক নির্মাতা দাবি করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে মেসির বিভিন্ন সম্পর্ক থাকার কারণে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতা উচিত নয়।
হিব্রু শিক্ষায় মেসির নাম
২০২০ সালে ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন হিব্রু ভাষা শেখানোর একটি ভিডিওতে মেসির নাম নিয়ে শব্দের খেলা ব্যবহার করে। সেখানে বলা হয়, হিব্রু শব্দ ‘মেসিবাহ’ অর্থ উৎসব বা পার্টি। স্প্যানিশ ভাষায় এর উচ্চারণ ‘মেসি বা’ (Messi va) বা মেসি যাচ্ছে এর মতো শোনায়। অর্থাৎ, ‘মেসি যেখানে যাবে, সেখানেই উৎসব হবে।’
