৪৮ দল, বাড়তি ম্যাচ ও ট্রাম্প বিতর্ক
কেমন কাটল ২০২৬ বিশ্বকাপ?
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের এই মেগা বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে দারুণ কিছু রূপকথা। তবে সেই সঙ্গে মাঠ ও মাঠের বাইরে পিছু ছাড়েনি বড় বড় বিতর্কও।
বিশ্বকাপের পরিধি বৃদ্ধি: সফল নাকি ব্যর্থ?
প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে অভিষেক ঘটে কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান এবং উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলোর। ফুটবল বোদ্ধাদের একাংশ আশঙ্কা করেছিলেন, দলের সংখ্যা বাড়লে হয়তো বিশ্বকাপের গুণগত মান কমে যাবে।
তবে মাঠের লড়াইয়ে অন্যরকম এক গল্প লিখেছে আটলান্টিক মহাসাগরের মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিদের রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। এমনকি নকআউটে আর্জেন্টিনাকেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় তারা। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার বীরত্বগাথা কিংবা জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইকুয়েডরের সঙ্গে কুরাসাওয়ের ড্র- এই রূপকথাগুলো না থাকলে গ্রুপ পর্ব বেশ ম্যাড়মেড়ে হতো বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নাকি বিজ্ঞাপনের খনি?
খেলোয়াড়দের কল্যাণের কথা বলে ফিফা প্রতিটি ম্যাচে বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি চালু করে। এমনকি আটলান্টা বা ড্যালাসের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম বজায় রাখা হয়।
তবে এই বিরতি মূলত সম্প্রচারকারী চ্যানেলগুলোর জন্য অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স স্পোর্টসের মতো চ্যানেলে এই ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন স্লটের মূল্য ছিল ২ থেকে ৩ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোতে সাড়ে ৭ লাখ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। দর্শকরা মাঠে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কোচেরা এই সময়টিকে পুরোদস্তুর কৌশলগত টাইমআউট হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা অনেক ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
কলিনার নতুন নিয়ম ও দ্রুতগতির ভিএআর
খেলার গতি বাড়াতে এবং ইচ্ছাকৃত সময় নষ্ট বন্ধ করতে ফিফার রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা একগুচ্ছ নতুন নিয়ম এনেছিলেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে অতিরিক্ত সময়ের কারণে ম্যাচ গড়ে ১০১ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতো, এবার তা কমে গড়ে ৯৬ মিনিটে নেমে এসেছে। ফলে বল মাঠে থাকার সময় এবং খেলার গতি- দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমর্থকদের স্বস্তি দিয়েছে।
গ্রুপ পর্বে ভিএআর প্রযুক্তি নিখুঁতভাবে কাজ করলেও নকআউট পর্বে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের একটি গোল বাতিলের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি তোলে। তবে ঘরোয়া লিগগুলোর তুলনায় বিশ্বকাপে ভিএআর রিভিউ অনেক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে।
টিকিটের আকাশচুম্বী দাম ও আইনি নোটিশ
টিকিটের চড়া মূল্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও স্টেডিয়ামগুলো প্রায় ৯৯.৭% পূর্ণ ছিল। মোট রেকর্ড সংখ্যক ৬৫ লাখেরও বেশি দর্শক গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করেছেন। তবে ফিফার টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়া এবং সেকেন্ডারি রিসেল প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত ৩০% ফি আদায়ের কারণে নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল ফিফাকে আইনি তলব করেছেন। এছাড়াও শুরুতে মাঠে পানির বোতল নিয়ে ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় ফিফা।
ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক বিতর্ক
এবারের বিশ্বকাপ শুরুই হয়েছিল ভূ-রাজনীতি আর ভিসা জটিলতা দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশ কিছু দেশের সমর্থকরা বিপাকে পড়েন। এমনকি সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে মিয়ামি বিমানবন্দরে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। ইরান দলকে কেবল ম্যাচের সময়টুকুতে মাত্র ২৪ ঘণ্টা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে বড় আলোড়ন তৈরি হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের সহ-আয়োজক ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা বাতিলের জন্য ফিফা সভাপতিকে সরাসরি ফোন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি এরপর নজিরবিহীনভাবে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা ১২ মাসের জন্য স্থগিত করে, যা ফুটবল বিশ্বে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। যদিও শেষ ১৬-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ফাইনালের নতুন সমীকরণ
ফিফার নতুন সিডিং পলিসির কারণে টুর্নামেন্টের শীর্ষ দুই দল আগেভাগে মুখোমুখি না হয়ে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। টেনিসের ড্র-এর মতো করে তৈরি করা এই নিয়মে ১ ও ২ নম্বর দল হিসেবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন সব বাধা পেরিয়ে রবিবারের ঐতিহাসিক ফাইনালে মুখোমুখি হয়।
সব মিলিয়ে, বিতর্ক ও বাণিজ্যের ভিড়েও ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ মাঠের রোমাঞ্চ আর নতুন দলগুলোর উত্থানের কারণে ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবেই জায়গা করে নিয়েছে।
