ধনী দেশগুলোর কৃপণতায় বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার প্রকোপ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:৫৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বিশ্বের ধনী দেশগুলো থেকে ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে অনেক কম। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৩০ কোটি ৭০ লাখ মানুষের ত্রাণ সহায়তার প্রয়োজন হবে, কিন্তু সহায়তা পাবে মাত্র ৬০ শতাংশ মানুষ। এর মানে, ২০২৫ সালে অন্তত ১১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ কোনো খাদ্য সহায়তা পাবে না।
২০২৪ সালে, জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছিল। তবে বছরের শেষে শুধু ৪৬ শতাংশ সহায়তা মিলবে, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় আরও কম। এর ফলে ত্রাণ সংস্থাগুলো কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যেমন তারা রেশন কমিয়ে দিচ্ছে এবং সহায়তাভোগীর তালিকাও সংকুচিত করছে।
বিশেষ করে সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সহায়তার সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মাধ্যমে এখানে সাধারণত ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য সহায়তা পায়। তবে চলতি বছরে খাদ্য সহায়তার তালিকা থেকে ১০ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ডব্লিউএফপির সহযোগী নির্বাহী পরিচালক রানিয়া দাগাস-কামারা বলেছেন, এখানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কম ক্ষুধার্তের কাছ থেকে খাবার নিয়ে 'ভীষণ' ক্ষুধার্তদের খাওয়াতে হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন, এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি, দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপে থাকা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সহায়তা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব বিভিন্ন দেশের সহায়তা প্রদাননীতিতে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি ২০২৩ সালের চেয়ে ২০২৪ সালে ৫০ কোটি ডলার কম সহায়তা প্রদান করেছে এবং ২০২৫ সালে আরো ১০০ কোটি ডলার কমানোর পরিকল্পনা করেছে।
এছাড়া, আগামী জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ডনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ত্রাণ সংস্থাগুলো। ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত তার প্রথম মেয়াদে সহায়তার পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তখন তার উপদেষ্টারা বিদেশি সহায়তায় কাটছাঁট করার পক্ষে মত দেন।
যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক মানবিক সহায়তায় শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে পরিচিত, তবে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬,৪৫০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে, যা মোট সহায়তার ৩৮ শতাংশ। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ মোট ১৭ হাজার কোটি ডলার সহায়তা পেয়েছে, যার ৫৮ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং ইউরোপিয়ান কমিশন থেকে। তবে রাশিয়া, চীন, এবং ভারতের অবদান ছিল খুবই কম, প্রায় ১ শতাংশের নিচে।
বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সহায়তার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ বিভাগের সাবেক প্রধান ইয়ান এইগুল্যান মন্তব্য করেছেন, "একটি ছোট দেশ নরওয়ে যদি শীর্ষ সহায়তাদাতা হয়, তবে বড় দেশগুলোর সহায়তা কতটা কম, তা সহজেই অনুমান করা যায়।" ২০২৩ সালে, নরওয়ে ১০০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে এবং সহায়তাদানকারী দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম অবস্থানে ছিল। অন্যদিকে, চীন ও ভারতের অবদান ছিল অত্যন্ত নগণ্য; চীন ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার এবং ভারত ৬৪ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে ত্রাণ সহায়তার সংকট মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে ক্ষুধার্ত এবং বিপর্যস্ত মানুষরা।
