মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের জন্য হচ্ছে জেল-নির্বাসন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এমন অনেক ব্যক্তিকে আটক, বিচারের আওতায় আনা এবং বহিষ্কার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত কনটেন্ট পোস্ট করার অভিযোগ রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা যেমন জারি করেছে, আবার বিচারিক আপিলের সুযোগ সীমিতও করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ করেছে, যার মধ্যে ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিল করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাহরাইন ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করার পর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘শত্রুভাবাপন্ন ইরানি কর্মকাণ্ডকে প্রশংসা বা সমর্থন করা, অথবা বাইরের পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার কারণে এসব ব্যক্তির বাহরাইনি নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।’
নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী ও কর্মীদের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। এসব পদক্ষেপকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
বাহরাইন ও কুয়েতে আটক ব্যক্তিরা বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। এই দেশগুলো বলছে, অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া, ভুয়া খবর ছড়ানো, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দুর্বল করার মতো অন্যান্য কর্মকাণ্ড।
সংঘাতের শুরুর দিকেই কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ তাদের ভূখণ্ডে ইরানি হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত ভিডিও বা তথ্য ধারণ ও প্রকাশ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। বাহরাইন ও কুয়েতে আটক ব্যক্তিদের পরিবার বলছে, তারা আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছামতো বা স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে ন্যায্য বিচারের সুযোগ না দেওয়া বা দোষী সাব্যস্তদের নাগরিকত্ব বাতিলও থাকতে পারে।
কুয়েতে নতুন নাগরিকত্ব আইন এবং বাহরাইনে সাম্প্রতিক এক রাজকীয় ডিক্রি জারির পর এমনটা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কুয়েতি কর্মী জানান, কর্তৃপক্ষ অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ চালু করেছে। এর মধ্যে কিছু সড়কে নিরাপত্তা চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন তল্লাশি করে বার্তা, ছবি ও ভয়েস নোট পরীক্ষা করেন।
কুয়েতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড
সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারের অভিযোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে রাখা ও তদন্তের পর কুয়েতের নিরাপত্তা আদালত গত ২৩ এপ্রিল ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দেয়।
সামাজিক মাধ্যম-সম্পর্কিত মামলায় ১৭ জন আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একজন পলাতক আসামিকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত ১০৯ জনকে শাস্তি না দিয়ে নির্দিষ্ট পোস্ট মুছে ফেলার নির্দেশ দেয়, আর নয়জনকে খালাস দেয়। সবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়া এবং ভুয়া খবর ছড়ানো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন আহমেদ শিহাব-এলদিন, যিনি মার্চের শুরুর দিকে কুয়েতে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আটক হয়েছিলেন। তিনি একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, যিনি একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। তার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এক বিবৃতিতে তার বোন লারা ও লুমার আন্তর্জাতিক আইনি উপদেষ্টা কাউইলফিওন গ্যালাঘার বলেন, ৫২ দিন আটক থাকার পর আহমেদকে সব অভিযোগ থেকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে—এতে আমরা স্বস্তি পেয়েছি।
নাগরিকত্ব বাতিলের আশঙ্কা
গত মার্চ মাসে কুয়েত একটি ডিক্রি জারি করে, যাতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে বা ‘ইচ্ছা করে তার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করে’ এমন উপাদান প্রকাশের জন্য তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার কুয়েতি দিনার (প্রায় ২০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা) জরিমানার বিধান রাখা হয়। সরকার আরও ঘোষণা দেয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ের জন্য বিশেষ আদালত গঠন করা হচ্ছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মাহমুদ শ্যালাবি বলেন, এসব পদক্ষেপ ব্যাপক আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করেছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
সূত্র- বিবিসি বাংলা
