খামেনির সঙ্গে আরাগচিও সেদিন মৃত্যুপথযাত্রী ছিলেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
ছবি : ফাইল ফটো
একটি আচমকা হামলা, অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া, আর তারপর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তা নিয়ে উৎকন্ঠা আর শঙ্কা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি এমন এক মর্মস্পর্শী ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যা আগে কখনো জনসমক্ষে আসেনি।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথমবারের মতো জানান, দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর হামলার সময় তিনিও একই ভবনে অবস্থান করছিলেন এবং কীভাবে তিনি ও খামেনি দুজনেই প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, সে বিবরণ তুলে ধরেন।
আরাগচি জানান, জেনেভায় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের প্রতিবেদন পেশ করতেই তিনি সেদিন সকাল ৯টার দিকে সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়ে যান। খামেনিকে তিনি জানাতে চেয়েছিলেন যে পরিস্থিতি এমন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তার সেই প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই ঘটে যায় বিপর্যয়।
তিনি বলেন, ‘আমি কার্যালয়ের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলোাম। হঠাৎ হামলা শুরু হয়। ভবনটির যে অংশে আমি ছিলোাম, সেটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, আমি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলোাম।’
ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরোনোর পরপরই তার প্রথম চিন্তা ছিলো, ‘সুপ্রিম লিডারকে কি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে? তিনি নিরাপদ তো?’ তিনি বলেন, ‘সেদিনের সেই আতঙ্কের মুহূর্তে মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিলো- খামেনি বেঁচে আছেন কি না।’
তবে শান্ত হতে সময় লাগে। এর কিছুক্ষণ পরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, খামেনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করছিলো আরেক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী ৪০ দিন তিনি নিজের ঘরে যেতে পারেননি, আত্মীয়স্বজনের কাছেও যাননি। পুরো সময় তিনি কাটিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে গেছেন একনাগাড়ে।
আরাগচি আরও জানান, ওই সংকটের সময় খামেনিকে নিরাপদ বাঙ্কারে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন সুপ্রিম লিডারের মুখে শোনা যায় এক দার্শনিকের মতো বাণী- ‘ইরানের প্রতিটি মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয় ও বাঙ্কারে যাওয়ার সুযোগ পায়, তবেই আমি নিরাপদ স্থানে যাব। যেহেতু বর্তমানে সেই সুযোগ সবার জন্য নেই, তাই আমিও জনগণের সঙ্গে মাটির ওপরই থাকব। আমার জনগণের ভাগ্যে যা ঘটবে, আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।’
আরাগচির মতে, খামেনির এই দূরদর্শী ও জনমুখী অবস্থানই তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। ‘শুধু রাষ্ট্র নয়, আমাদের নেতা মানুষের হৃদয় শাসন করতেন’—মন্তব্য করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি দাবি করেন, চলমান সংঘাতের সময় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশনা সরাসরি আসত খামেনির কাছ থেকেই। বাস্তবে যুদ্ধসংক্রান্ত সব নির্দেশনা তিনি নিজেই দিতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাদের মিত্রদের সমালোচনা প্রসঙ্গে আরাগচি বলেন, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। অনেকে ধারণা করেছিলেন ইরান দ্রুত জবাব দিতে পারবে না, কিন্তু তেহরান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে।
এই সাক্ষাৎকারটি ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গভীর ও দুর্লভ দলিল হয়ে থাকলো, যেখানে একটি হামলা শুধু একটি ভবন নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চেতনাকেই নাড়া দিয়েছিলো। তবে আরাগচি ও খামেনির এই টিকে থাকার গল্প প্রমাণ করে যে, মাঝেমধ্যে ইতিহাসের বাঁক বদলে যায় কয়েক ইঞ্চি ধ্বংসস্তূপের তলায় লুকিয়ে থাকা সৌভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।
