যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা সমঝোতা: লাভের পাল্লা কার দিকে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানো এবং চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রকাশ্যে এসেছে। এতে যুদ্ধবিরতি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার, ইরানের জব্দ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৭ জুন মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সমঝোতার বিভিন্ন ধারা প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। এরপর ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমঝোতার প্রধান বিষয়গুলো
নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধে সম্মত হয়েছে। উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। চুক্তিতে দেশটির ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ থাকা সম্পদ ও তহবিল ব্যবহারের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ সমঝোতার পথ অনুসরণ করেছে। ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলবে এবং এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
১৪ দফা সমঝোতার সারসংক্ষেপ
১. উভয় পক্ষ ও তাদের মিত্ররা অবিলম্বে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধ শুরু করবে না। লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত।
২. দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।
৩. সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে। চূড়ান্ত চুক্তির পর ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
৫. ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণের উদ্যোগ নেবে।
৬. ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হবে।
৮. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাবে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় থাকবে। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থান ধরে রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
১০. ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে মার্কিন ছাড় দেওয়া হবে, যার আওতায় ব্যাংকিং, পরিবহন ও বিমা সেবাও থাকবে।
১১. ইরানের জব্দ বা অবরুদ্ধ তহবিল ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
১২. সমঝোতা বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি যৌথ নির্বাহী কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়েছে।
১৩. এমওইউ স্বাক্ষরের পর নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারা অবিলম্বে কার্যকর করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে।
১৪. ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
লাভের পাল্লা কার দিকে?
সমঝোতার ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিকভাবে ইরান তুলনামূলকভাবে বেশি তাৎক্ষণিক সুবিধা পেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া, তেল রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি এবং জব্দ সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো বজায় রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাসের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সুযোগ।
তবে এই সমঝোতার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তি এবং তার বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারস্পরিক আস্থার বিষয়গুলো ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের প্রধান লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ পায়। অর্থনৈতিক সুবিধার ক্ষেত্রে ইরান এবং নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার লাভ কতটা স্থায়ী ও কার্যকর হবে।
