দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
খামেনির জানাজা থেকে ট্রাম্পকে ‘হত্যার ডাক’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠানের মূল ফটক। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিহত হন। টানা যুদ্ধের কারণে খামেনির জানাজা আয়োজনে দেরি হয়। এখন ইরানজুড়ে সপ্তাহব্যাপী খামেনির শোকযাত্রা ও শেষ বিদায়ের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ইরানের সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতা ও তার পরিবারের চার সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে এই জানাজা ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক প্রদর্শনী। এখানে, শোক আর প্রতিশোধের সংকল্প মিলেমিশে একাকার হয়েছে।
খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ রাতভর মসজিদে অবস্থান করেন। অনেকে ভোরের আলো ফোটার আগেই সেখানে পৌঁছে যান। সকাল ৮টায় জানাজা শুরুর অনেক আগেই তারা সব প্রস্তুতি সেরে ফেলেন।
শোকার্ত মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা এবং তাদের নেতার ছবি। অনেকে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। গত শনিবারের তুলনায় রোববার (৫ জুলাই) ভীড় ছিল অনেক বেশি। জনতা ছিল বেশ উত্তেজিত। এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকে ইরানের সামাজিক সংহতি ও স্বাধীনতার প্রশ্নে অটল থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
জানাজা শুরুর আগে বিদায়ী অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন ইরানের কবি মোহাম্মদ রাসউলি। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে কাফন হবে আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম খেয়ে বলছি, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।’

তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটি (ট্রাম্প) কেন এখনও বেঁচে আছে? ট্রাম্পের জন্য পৃথিবী এখন আর নিরাপদ জায়গা নয়। আমাদের ইমামের হত্যাকারীকে আমরা কেন মারব না? তাকে খতম করতে না পারা হবে আমাদের জন্য বড় কলঙ্ক।’
তার এই বক্তব্য ছিল পূর্বনির্ধারিত ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত। উপস্থিত জনতা, বিপুল করতালির মাধ্যমে তার এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান।
আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা মানুষকে হত্যা করতে পারেন, কিন্তু আদর্শকে নয়। আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করে আসলে একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছেন। এখন সেই সুবাস সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের কোনো সভ্যতা, ইতিহাস বা সম্মান নেই, তারা কখনোই এই ত্যাগের মহিমা বুঝবে না।’
জানাজার মূল নামাজে ইমামতি করেন কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সি প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের তিন সদস্যের জন্যও দোয়া করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন খামেনির পুত্রবধূ জোহরা হাদ্দাদ আদেল এবং তার ১৪ মাস বয়সি নাতনি জোহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি। অনুষ্ঠানে সেই ছোট্ট শিশুর কফিনটি ছিল সবচেয়ে করুণ দৃশ্য। এটি দেখে উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। বাবার মৃত্যুর পর রোববার মসজিদে তার তিন ভাইকে দেখা গেলেও, মোজতবাকে দেখা যায়নি। তার এই অনুপস্থিতি সবার নজর কেড়েছে।
বাবার মৃত্যুর ১০ দিন পর মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত তিন মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এমনকি কোনো অডিও বার্তাও দেননি তিনি। গত বৃহস্পতিবার নিজের স্ত্রীর জানাজায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তবে তার তিন ভাই—মোস্তফা, মাসুদ ও মেসামকে তাদের বাবার কফিনের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ইরান সরকারের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানাজায় অংশ নেন। কর্মকর্তারা সেখানে বেশ নিশ্চিন্ত মনে উপস্থিত ছিলেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে জানাজায় হামলা না করার ব্যাপারে কোনো আশ্বাস রয়েছে। কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কায়ানি এবং আইআরজিসি প্রধান আহমদ ওয়াহিদিও সবার সামনে উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে, এমন দৃশ্য কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
মোজতবা খামেনিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার এক কঠোর সংকল্প দেখা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লরা লুমারের একটি মন্তব্য থেকে এর কারণ আঁচ করা যায়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই জানাজাকে হামলার জন্য একটি ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন রক্ষণশীল বিশ্লেষক মার্ক লেভিনও মনে করেন, এই জানাজায় হামলা না করা একটি ‘সুযোগ হারানো’।
মসজিদের চারপাশের রাস্তাগুলো মোজতবা ও তার বাবার ছবিতে ছেয়ে গেছে। ধর্মীয় আলেমরা সেখানে স্টল বসিয়ে মোজতবার দেওয়া ভাষণের বই বিলি করছেন। যুদ্ধের প্রথম দিনের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে মোজতবা আহত হয়েছিলেন বলে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। তবে তারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে তার চেহারা বিকৃত হয়নি বা কোনো অঙ্গহানি ঘটেনি।
মসজিদের দেয়ালে শোকাতুর মানুষ তাদের প্রয়াত নেতার প্রতি ভালোবাসা ও নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য জানিয়ে নানা বার্তা লিখেছেন। জানাজায় উপস্থিত মানুষেরা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরমে দাঁড়িয়ে লাল পতাকা নাড়াচ্ছিলেন। এ সময় পুরো প্রাঙ্গণ ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়, কেবল প্রতিশোধ’—স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ধারণক্ষমতার এই চত্বর, ভোরের আগে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অনেক পুরুষকে সাদা কাফন পরে জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, নেতার জন্য তারা শহীদ হতে প্রস্তুত। ৪০ বছর ধরে কাজ চললেও, এই মসজিদটি এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ভবনের অনেক অংশ ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এর নির্মাণকাজ শেষ করা যায়নি। ফলে ভবনটি এখন পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
জানাজায় উপস্থিতির কোনো সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হচ্ছে, প্রথম দিনে ২০ লাখের বেশি মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। সোমবার (৬ জুলাই) তেহরানে এক বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মরদেহটি পবিত্র শহর কোম এবং পরে ইরাকের দুটি পবিত্র শহরে নিয়ে যাওয়া হবে। সবশেষে ১৯৩৯ সালে খামেনির জন্মস্থান মাশহাদে তাকে সমাহিত করা হবে।
অজান্তেই ইরানি নেতৃত্বের হাতে তুরুপের তাস তুলে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শোকাহত মানুষকে কাঁদতে দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম ওরা ওকে ঘৃণা করে।’ তার ধারণা ছিল, মানুষের চোখে এসব আসলে ‘সাজানো কান্না’।
তবে সাধারণ মানুষের সেই শোক ছিল একেবারে অকৃত্রিম। প্রায় চার দশক ধরে খামেনি ছিলেন ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা। তার মৃত্যুতে শোকাতুর মানুষের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আকুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে স্বল্প সামর্থ্য নিয়ে বহু দূর থেকে এসেছেন তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে। তেহরানে আসা এই মানুষগুলো গত তিন দিন ধরে স্কুলের শ্রেণিকক্ষ বা তেলের দপ্তরের মেঝেতে রাত কাটিয়েছেন। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন মানুষের ব্যক্তিগত বাড়িতে।
মসজিদের আশপাশের এলাকায়, মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসী বিভিন্ন খাবারের স্টল বসিয়েছেন। গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে পথচারীদের জন্য তরমুজ, কাবাব রোল ও ফলের রস দেওয়া হচ্ছিল। বোয়ের-আহমাদ থেকে আসা লায়লা আহমাদি, হাসিমুখে চা পরিবেশন করছিলেন। তিনি বললেন, ‘প্রয়োজনে আমরা সাধারণ কৃষি সরঞ্জাম (পিচফর্ক) দিয়ে আমেরিকানদের সঙ্গে লড়ব।’
তেহরানে মধ্যরাতের পরেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভীড় করছেন। তাদের হাতে ছিল খামেনির ছবি সংবলিত ব্যানার ও পতাকা। রাজধানীর প্রধান চত্বরগুলোতে প্রতি রাতে আবেগঘন র্যালি ও সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জানাজায় অংশ নেওয়া ৭০ বছর বয়সি বই অনুবাদক হুসাইন দেহঘান নিজের অনুভূতি জানান। তিনি বলেন, ‘নেতাকে এভাবে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সবাই এখন একে অপরের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পশ্চিমারা তাকে স্বৈরাচার বলে ডাকত। এটা ঠিক সব ইরানির কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল। যুদ্ধ ঘোষণা না করে অন্য একটি দেশের শীর্ষ নেতাকে এভাবে হত্যা করা একেবারে অগ্রহণযোগ্য। আলোচনার মাঝপথে এই হামলা ছিল নিছক প্রতারণা। এটি বুঝিয়ে দেয়, আমেরিকার কাছে ইসরায়েলের গুরুত্ব কতটা বেশি। তাদের লক্ষ্য হয়তো ইরানকে আমেরিকান উপনিবেশ বানানো। কিন্তু ইরান দীর্ঘ ইতিহাসের একটি দেশ। যখন কোনো দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন সেই জাতি লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ হয়।’
বছরের শুরুর দিকে সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া গণবিক্ষোভের প্রসঙ্গও টানেন দেহঘান। সেই বিক্ষোভগুলো কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। দেহঘান বলেন, ‘জানুয়ারিতে যারা বিক্ষোভ করেছিল, সেই তরুণদের অনেকেই এখন সত্য বুঝতে পারছে। তারা এখন জানে যে আমেরিকান বা ইসরায়েলিরা আসলে সাধারণ মানুষের ভালো চায় না।’
ইব্রাহিম কলিম নামের দীর্ঘদিনের এক বাসিন্দা নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় ইসরায়েলি বোমার আঘাতে আমি প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে ফিরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সে সময়ের পরিস্থিতি আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। রাতে কয়েক মাইল দূরে বিশটিরও বেশি বোমা পড়ার শব্দ আসত। বোমার শব্দে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠত। আমরা কেবল বোঝার চেষ্টা করতাম বোমাগুলো কি আমাদের আরও কাছে আসছে কি না। মাথার ওপর দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত অপমানের।’
‘অনেকে এখানে সংস্কার চায়। তবে সেই সংস্কার হতে হবে আমাদের নিজেদের পরিকল্পনায়। আমেরিকানরা এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে পারে না। নিজের সরকারের সঙ্গে দ্বিমত থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু জন্মভূমি আক্রান্ত হলে সেই দেশকে রক্ষা করাও মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য।’
কয়েক মাইল দূরে উত্তর তেহরানের মধ্যবিত্ত এলাকায় আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোতে পরিবার নিয়ে মানুষকে সময় কাটাতে দেখা যায়। তাদের অনেকের মাথায় হিজাব ছিল না। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তেহরানের এই অংশটি আরব আমিরাতের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। বর্তমানে সব ইরানি চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই কষ্টের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়েনি।
যারা জানাজায় অংশ নিয়েছেন এবং যারা নেননি—এই দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত
লেখক: প্যাট্রিক উইন্টুর দ্য গার্ডিয়ানের কূটনৈতিক সম্পাদক
