বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উদ্বেগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক লাখ লাখ মানুষের জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং আসক্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
প্রতিবেদনটিতে "মেটালফ্রিক" ছদ্মনামে এক ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, একসময় পোষা পাখির যত্ন নেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু দীর্ঘদিন ইয়াবা সেবনের কারণে এখন তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন না। তার ভাষায়, এই মাদক তার মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
থাই ভাষায় "ইয়াবা" শব্দের অর্থ "পাগলা ওষুধ"। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বর্তমানে এই মাদকে আসক্ত এবং এ সংখ্যা বাড়ছে। ইয়াবা সাধারণত টিনফয়েলের ওপর গরম করে ধোঁয়া টেনে সেবন করা হয়। একজন ব্যবহারকারীর মতে, একটি বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এতে অনেকেই টানা কয়েকদিন জেগে থাকেন, এরপর দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে কাটান।
প্রতিবেদনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে উল্লেখ করা হয়, গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে একটি আইনও পাস হয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়াবা 'ক' শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক। ২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে কয়েক মাসে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর মোট ৪৬৬ জন নিহত হন। এসব ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর অভিযান সত্ত্বেও মাদকের ব্যবহার কমেনি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র প্রায় ৩৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। একইভাবে দক্ষ মনোবিজ্ঞানীরও সংকট রয়েছে। তিনি মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এমন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডা. আরিফুজ্জামানের মতে, বর্তমানে ইয়াবা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদকগুলোর একটি। অনেক আসক্ত একই সঙ্গে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন ট্যাবলেটও গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, মানসিক দুর্বলতা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা কোভিড-১৯-এর মতো সংকটও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তার মতে, অনেক ব্যবহারকারী নেশার খরচ চালাতে পরে মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। আবার অনেকেই মানসিক সমস্যার কারণে প্রথমে মাদকের আশ্রয় নেন।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থার (UNODC) তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তবর্তী "গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল" অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার বড় অংশ মিয়ানমারে উৎপাদিত বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়া "মেটালফ্রিক" জানান, অনেক ব্যবহারকারী প্রথমে সিগারেট, পরে গাঁজা এবং এরপর ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার দাবি, আগে ইয়াবা ছিল ব্যয়বহুল, এখন কম দামি সংস্করণও সহজে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন সেবনের ফলে দাঁতের ক্ষয়, খিঁচুনি, স্ট্রোকসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ইয়াবা অন্য অনেক মাদককে প্রায় প্রতিস্থাপন করেছে এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই এর কেনাবেচা দেখা যায়।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বাস্তবতা অনেক মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে "মেটালফ্রিক" বলেন, ইয়াবা মানুষকে সাময়িকভাবে আত্মবিশ্বাসী মনে করালেও ধীরে ধীরে তা শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তার ভাষায়, এটি "ধীরগতির বিষের" মতো কাজ করে।
