মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী ‘ইসলামিক ন্যাটো’র আদলে নতুন গেমচেঞ্জার
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে ভুগছে মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে এই যুদ্ধ থেকে সরাসরি দূরে থাকতে চাইলেও ইয়েমেনে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে হুতিদের অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে দেশটি। শুধু সৌদি আরব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমন জটিল যে- যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল প্রতিটি দেশই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
এমন আবহে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্য। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। পবিত্র মক্কা নগরীতে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির আওতায় এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে এই চুক্তি ন্যাটোর মতো একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠনের আলোচনা উসকে দিয়েছে। যা ভবিষ্যতে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র রূপ নিতে পারে। আর এর মাধ্যমে বদল হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য।
মূলত ন্যাটো হলো উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট, যা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক সংস্থা। এটি ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়। ন্যাটোর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত। ন্যাটোর মূল নীতি হলো- কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সব সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ। একে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বা কালেক্টিভ ডিফেন্স বলা হয়। রাজনৈতিক ও সামরিক উপায়ে সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর কাজ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করে ন্যাটো। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান ও পারস্পরিক সহযোগিতাও তৈরি করে সংস্থাটি।
ন্যাটোর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, তুরস্ক। এছাড়া বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, স্পেন, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেনসহ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অন্যান্য দেশ। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ফিনল্যান্ড এবং ২০২৪ সালে সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়।
অপরদিকে ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া এক অস্থির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটল। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র বলে পরিচিত পারস্য উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর তেহরানের পাল্টা আঘাতে এই জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব। সংঘাত-বিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে তিনটি সুন্নি মুসলিম দেশের এমন সামরিক সহযোগিতা এক শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা দিচ্ছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের এই তিন অংশীদারেরই অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু নিজস্ব সম্পদ বা শক্তির জায়গা রয়েছে। যেমন পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম দেশ, যার পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে। তুরস্কের রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাশিল্প ও ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক বাহিনী। আর বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল আর্থিক শক্তি ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক সেনাবাহিনী।
গত শুক্রবার মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের পর যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক বলেছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধের সক্ষমতা জোরদার করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। নতুন জোটের আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটিও গঠিত হবে। এসব কমিটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানরা থাকবেন। সৌদি আরবে থাকবে একটি সচিবালয়। তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন ও সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অঞ্চল ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তবে এই মুহূর্তে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের অনেক বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। সংকটকালে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটি এই চুক্তির মধ্যে রয়েছে।’
তুরস্কের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার একটি ধারা রয়েছে। এটি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক। এতে শুধু আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের এতে যোগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এটি বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি বাতিল বা প্রতিস্থাপন করে না।
চুক্তিতে সইকারী তিন দেশের আরেকটি সাধারণ অবস্থান হলো- তারা ইসরায়েল ও বিপ্লবী শিয়া রাষ্ট্র ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসি সামরিক অবস্থান নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। এমন এক সময়ে এই চুক্তি করা হলো, যখন তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, ‘এ ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তিনটি দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলভিত্তিক একটি নিজস্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও অবদান রাখবে।’
এদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইরান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানকে আশ্বস্ত করে গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ‘চুক্তিতে ইরান কিংবা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। আমরা লিখিতভাবে কোনো অভিন্ন হুমকির কথা উল্লেখ করিনি।’
ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ‘কারিগরিভাবে’ ন্যাটোর আর্টিকেল-৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর এ যৌথ প্রতিরক্ষা ধারায় কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের হামলার জবাব কেমন হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। তবে আংকারার আশ্বাস সত্ত্বেও কিছু ইরানি কর্মকর্তা এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেইসঙ্গে নিরাপত্তার জন্য নতুন অংশীদারদের ওপর নির্ভর না করার ব্যাপারে সৌদি আরবকে সতর্ক করেছেন তারা।
ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য মাহমুদ নাভাবিয়ান বলেছেন, ‘সৌদি নেতাদের বোঝা উচিত যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না।’ কমিশনের আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজাই এই চুক্তিকে একটি ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। আল-জাজিরা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামার আরটিকে বলেছেন, ‘আমি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বা একটি নতুন নিরাপত্তা ব্লক কিংবা নতুন কোনো জোট বা মেরুকরণ বলার মতো পর্যায়ে যাব না। অতীতেও এই ধরনের জোট গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে। তা সফল হয়নি।’
উল্লেখ্য, সর্বশেষ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি যে রাতারাতি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেবে কিংবা গেমচেঞ্জার হবে, এমনটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সংকটকালীন সময়ে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। অপরদিকে এই চুক্তি ন্যাটোর আর্টিকেল-৫-এর আদলে গড়া হলেও সংকটের মুহূর্তে ওই তিন দেশ কীভাবে এবং কত দ্রুত সামরিক সহায়তা দেবে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়।
