শান্তিতে নোবেল পাওয়া কে এই নাভি পিল্লাই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে তিনি দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
নাভি পিল্লাইয়ের জীবন, কর্ম এবং তাঁর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. জন্ম ও শিক্ষাজীবন
জন্ম: ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর জন্মকালীন পারিবারিক নাম ছিল নাভানেথেম নাইডু।
শিক্ষা: তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে এলএলএম এবং ডক্টরেট (এসজেডি) ডিগ্রি লাভ করেন।
উল্লেখ্য, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান নারী হলেন নাভি পিল্লাই।
২. বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম ও কর্মজীবনের শুরু
দক্ষিণ আফ্রিকায় তৎকালীন বর্ণবাদী (অ্যাপার্টেইড) শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন।বর্ণবাদী সরকারের জাঁতাকলে নির্যাতিত রাজনৈতিক বন্দি, কর্মী এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে আদালতে আইনি লড়াকু ভূমিকা পালন করেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং অন্যান্য রাজবন্দিদের আইনি সহায়তার মধ্য দিয়েই মূলত তাঁর বর্ণিল কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
আরও পড়ুন: রিয়াদ বিমানবন্দরে তৃতীয় দফা হামলা চালালো হুথিরা
৩. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা ও বিচারিক দায়িত্ব
জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে নাভি পিল্লাই বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে:
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার: ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: রুয়ান্ডায় সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি বিচারক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেখানে ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ):
তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বমঞ্চে যুদ্ধাপরাধী ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তিনি সবসময় আপসহীন ছিলেন।
৪. নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির নেপথ্য কারণ
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি নাভি পিল্লাইকে এই পুরস্কারে ভূষিত করার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে—
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের অবিচল সাধনা।
অত্যন্ত সংকটপূর্ণ সময়ে সাহসিকতা: বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যখন আন্তর্জাতিক বিচার ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা চাপ ও হুমকির মুখে, তখন তিনি চরম সাহসিকতা ও নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।
যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার: রাষ্ট্রীয় সীমা কিংবা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করতে তাঁর অসামান্য অবদান।
নোবেল কমিটির মতে, রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং সংঘাতের শিকার নিপীড়িত মানুষের মনে ন্যায়বিচারের আশা জাগাতে নাভি পিল্লাই এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে গেছেন।
