×

জামায়াত

জামায়াত জোটে কী হচ্ছে, এনসিপিসহ শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

জামায়াত জোটে কী হচ্ছে, এনসিপিসহ শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ও সমঝোতা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে টানাপড়েন বাড়ছে। জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে প্রার্থিতা নিয়ে মতবিরোধ জোটের অভ্যন্তরীণ সংকটকে সামনে এনেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছে জামায়াত। দলটির এ অবস্থানে এনসিপিসহ অন্য শরিকদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে জোটের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক কয়েকটি ধর্মীয় দলের বেরিয়ে যাওয়ার তৎপরতার খবরও সামনে এসেছিল। সব মিলিয়ে জোটের ভবিষ্যৎ এবং জামায়াত-এনসিপির সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি এ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও এনসিপির নেতারা বলছেন, সংসদ, সংস্কার ও বিচারসংক্রান্ত ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য রয়েছে। তবে জনজীবনের সংকট ও জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁরা এখন স্বতন্ত্রভাবে মাঠে নামতে চান।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, তাঁরা ১১ দলীয় জোটে আছেন। তবে জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করা প্রয়োজন বলে তাঁদের মনে হয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো অতীতেও আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। এবারও একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে জোটের কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করেন তাঁরা।

তবে জোটের অন্যতম শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে।

প্রার্থী বাছাই নিয়ে জামায়াত-এনসিপির টানাপড়েন

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে টানাপড়েনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁকে প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা চেয়েছিল এনসিপি। কিন্তু জামায়াত নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার দিকেই এগিয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াত মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম ঠিক করেছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির অনানুষ্ঠানিক মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম।

এর আগে এনসিপি ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ এবং উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদিবকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তরের ভোটার হন। একই সময়ে এনসিপির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা দক্ষিণের ভোটার হন।

জানা গেছে, আসিফ মাহমুদের বিষয়ে জামায়াত ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার পরিকল্পনা করছে এনসিপি।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এসব নির্বাচনেও এককভাবে অংশ নিতে আগ্রহী জামায়াত। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জোটের শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জোট নিয়ে স্বস্তিতে নেই শরিকরাও

১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও মনে করেন, নির্বাচনী সমঝোতার প্রশ্নে জোটের মধ্যে সংকট তৈরি হতে পারে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, এই জোট কোনো আদর্শিক জোট নয়। শুরুতে এটি ছিল ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতেই ঐক্যটি গড়ে উঠেছিল।

মঞ্জুর মতে, জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নই জোটের ঐক্য ধরে রাখার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “আমরা নিজেরাও এই জোটে কমফোর্টেবল না। সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করলে তো এই ঐক্যের আর কার্যকারিতা থাকে না। তাছাড়া সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোটভুক্ত একেক দল একেকভাবে নির্বাচন করতে চাইছে। ফলে আমার ধারণা, সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে।”

জনগণের দাবিতে আলাদা কর্মসূচি চায় এনসিপি

স্থানীয় নির্বাচন ছাড়াও জনজীবনের বিভিন্ন সংকট নিয়ে কর্মসূচি পালনের প্রশ্নে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সংসদ, সংস্কার ও বিচারসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁরা জামায়াতের সঙ্গে জোটে রয়েছেন। এসব ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই।

তবে জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে মাঠে নামার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তাঁরা।

পাটওয়ারী বলেন, “আমাদের মনে হয়েছে, আমাদের এখন এককভাবে মাঠে নামা প্রয়োজন। সে কারণে আমাদের যে এজেন্ডা বা কর্মসূচি, তা নিয়ে মাঠে নেমেছি। শনিবার লংমার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম না থাকায় দূরত্বের আলোচনা আসছে। কিন্তু আমরা ১১ দলীয় জোটে আছি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবেই করব। শুধু জনগণের যে দাবিদাওয়া, সেগুলো নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে মাঠে থাকব।”

অর্থাৎ, এতদিন জনজীবনের সংকট নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করলেও এখন এসব বিষয়ে আলাদাভাবে সক্রিয় হতে চায় এনসিপি। জোটের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার পেছনে এই অবস্থানেরও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

জোট ভাঙার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে জামায়াত

এনসিপির স্বতন্ত্র কর্মসূচি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে জোটের সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ জামায়াত।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো সবসময় আলাদাভাবে অংশ নিয়ে এসেছে। এবারও তাঁরা সেই অবস্থানে রয়েছেন।

তিনি বলেন, “জোট আছে ও থাকবে। স্থানীয় সরকার নিয়ে অতীতের যে অবস্থান জামায়াতের, সেখানেই আছে। এসব নিয়ে জোটে সমস্যা হবে না। আমাদের জোটে যারা আছে, তারা থাকবে। কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা সফল হবে না।”

তবে জামায়াতের আশ্বাসের বিপরীতে শরিক দলগুলোর বক্তব্যে প্রার্থিতা নিয়ে অসন্তোষ এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ভিন্নমতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

যেভাবে গড়ে ওঠে ১১ দলীয় ঐক্য

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা ইসলামি দলগুলোর এক বাক্সে ভোটের স্লোগান সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আটটি ধর্মভিত্তিক দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করে।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দিলে এটি ১১ দলীয় ঐক্যে রূপ নেয়।

নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল জোটটি। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আন্দোলন থেকে সরে এসে নির্বাচনী কার্যক্রমে মনোযোগ দেয় দলগুলো।

নির্বাচনের পর গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ ও মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান।

কিন্তু জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জোটের মূল লক্ষ্য ও কর্মসূচি কী হবে, তা নিয়ে শরিকদের মধ্যে ভিন্ন অবস্থান তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী সমঝোতা না হওয়া এবং পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনা ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সব মিলিয়ে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য আনুষ্ঠানিকভাবে অটুট থাকলেও নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী বাছাই এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে শরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই মতপার্থক্য কতটা গভীর হয়, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে জোটের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার চেষ্টা, আওয়ামী লীগের ১১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার চেষ্টা, আওয়ামী লীগের ১১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

জামায়াত জোটে কী হচ্ছে, এনসিপিসহ শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

জামায়াত জোটে কী হচ্ছে, এনসিপিসহ শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

যেসব কারণে নতুন কাঠামোতে বেতন পায়নি লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী

যেসব কারণে নতুন কাঠামোতে বেতন পায়নি লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App