চরম দুর্ভোগ
৩৬ বছরের দাবির সেতু আট বছরেও অপূর্ণ
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
খুলনার ডুমুরিয়ায় সিংগা নদীর ওপর মাত্র ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের টিপনা সিংগা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিতে গত ৩৬ বছর ধরে আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে আসছিলেন নদীর দুই পাড়ের টিপনা, সিংগাসহ আশপাশের এলাকার মানুষ। পরে ২০১৮ সালে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষের যাতায়াত সহজ করতে সেখানে সেতু নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ ও পরবর্তী সংশোধন মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয় ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘আকন ট্রেডিং’ ও ‘মাহফুজ খান (জেভি)’ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজের কার্যাদেশ পায়। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও কাজের অগ্রগতি অর্ধেকের কাছাকাছি রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর পর আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে সেতুর মূল কাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্প এলাকায় স্তূপ করে রাখা রডসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
সিংগা গ্রামের বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকাটিতে বহু পরিবারের বসবাস রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মন্দির। বর্তমানে এলাকাবাসী নিজেদের অর্থায়নে সেতুর পূর্ব পাশে বাঁশ ও কাঠের তক্তা দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
বর্ষা মৌসুমে ডিঙি নৌকাই পারাপারের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন গর্ভবতী নারী ও জরুরি রোগীরা। কেউ অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে।
এলাকার বাসিন্দা মো. নিছার আলী সরদার, শিবপদ গাইন ও অনিমেষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর সেতুর বরাদ্দ পেলেও ঠিকাদারের গাফিলতি আর প্রশাসনের উদাসীনতার বলি হচ্ছি আমরা। প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে ভয়ে থাকি। অবিলম্বে এই সেতুর বাকি কাজ শেষ করে আমাদের মুক্তি দিন।”
খর্ণিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোল্লা আবুল কাশেম বলেন, “সেতুটি আমাদের এলাকার মানুষের জন্য একটি স্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু আট বছর ধরে এটি অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখন তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মেম্বার হিসেবে প্রতিদিন আমাকে সাধারণ মানুষের হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ আইনি জটিলতার কারণে আমি নিজে চাইলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, “সামনে বর্ষাকাল আসছে। বর্ষা এলেই নদীর পানি বেড়ে গিয়ে আমাদের তৈরি অস্থায়ী সাঁকোটি ডুবে যায়। তখন পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের পারাপারে চরম বিঘ্ন ঘটে। প্রশাসনের কাছে বিনীত অনুরোধ, দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ দূর করা হোক।”
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. দারুল হুদা বলেন, “এলাকার মানুষের জন্য সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর কারণে আইনি ও কারিগরি জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে সেতুর সিসি ও পিসি গার্ডারসহ প্রধান কাঠামোর কাজ অনেকটাই এগিয়ে আছে। বাকি কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত অন্য ঠিকাদার বা বিকল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ পুনরায় শুরু করে জনদুর্ভোগ লাঘবের চেষ্টা চলছে।”
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বলেন, “জনগুরুত্বপূর্ণ এই সেতু নিয়ে এলাকাবাসীর ভোগান্তি আমরা বুঝতে পারছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইনি জটিলতা নিরসন করে দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু করতে উপজেলা প্রশাসন এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে।”
খুলনা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদার বলেন, “জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রকল্পটি দ্রুত সচল করার লক্ষ্যে লজিস্টিক ও আইনি প্রক্রিয়াগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এর ইতিবাচক সমাধান আসবে বলে আশা করছি।”
