পদ্মায় পানি বৃদ্ধিতে ১৮ স্কুলে পাঠদান স্থগিত, দুজনের মৃত্যু
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে ভোগান্তিতে চরাঞ্চলের মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ঢুকছে পদ্মার পানি। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষজনের আশ্রয়ের জন্য খোলা থাকছে।
তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পানি বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে পদ্মায় ডুবে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ২ সেন্টিমিটার। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৮৮ সেন্টিমিটার। ফলে মাত্র ১৮ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার।
অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত পয়েন্টেও দ্রুত বাড়ছে পানি। শুক্রবার সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৫২ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৬২ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে পানি। পাউবো জানিয়েছে, ভাগজোত পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির এই গতি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ তলিয়ে গেছে। এতে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে পানি ঢ়ুকে পড়েছে। এতে রোপা আমন, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, এরইমধ্যে নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বসতবাড়ির কাছাকাছি পানি পৌঁছে যাওয়ায় গবাদিপশুর নিরাপত্তা, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। পানি বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে পাপ্পু খান (১৫) ও মুস্তাকিম (১২) নামে দুজনের পদ্মায় ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পানি আরো বাড়লে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
চিলমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান জানান, প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের জন্য দ্রুত সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া না হলেও দুর্গত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আপাতত ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষজন সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দুর্গত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দী মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, 'আমার উপজেলার দুটি ইউনিয়নের মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। এসব মানুষের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে যা যা করার প্রয়োজন তা করা হবে।'
