খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি: টিআইবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
ফাইল ছবি
২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের খসড়ায় এমন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা এবং জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার—এই তিনটি জটিল বিষয়কে একটি আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তিনটির কোনোটিই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা এবং অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে।’
আরও পড়ুন: তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতকে নিয়ে চিফ হুইপ
তিনি বলেন, ‘সাইবার অপরাধের সঙ্গে সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে একাকার করার পাশাপাশি সাইবার জগতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, যা এ ধরনের আইনের আওতাবহির্ভূত এবং বৈশ্বিক উত্তম চর্চার পরিপন্থী।’
অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের আশঙ্কা
খসড়া আইনটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীনতা ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে গুজব, অপতথ্য, হেয় প্রতিপন্ন, মানহানিকর ও রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর—এ ধরনের বেশ কিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার এবং বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।’
এ ছাড়া ‘যৌন হয়রানি’ ও ‘সেক্সটর্শন’-এর মতো শব্দবন্ধকে ‘অপেশাদার ও অসম্পূর্ণভাবে’ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর অধিকার হরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ধারা ৪৬-এর উপধারা (২)-এ অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধারা ২৩-এর উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এবং ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে’—এ ধরনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তার মতে, এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি এবং বাস্তবে এর প্রয়োগ ক্ষমতাসীনদের মর্জিনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে অপব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমত ও বাকস্বাধীনতা ব্যাপক হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল নিয়ে আপত্তি
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের সমন্বয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হলেও বেসরকারি পর্যায়ের ‘তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। তারাও সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন।
ফলে ‘সুরক্ষা কাউন্সিল’ সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন হয়ে কোনো ধরনের জবাবদিহি ছাড়াই আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ধরনের বিধান ঢেলে সাজিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন: ‘ভালো ও সৎ মানুষের রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন’
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন সাপেক্ষে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের পরিবর্তে কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছে টিআইবি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কাউন্সিলের সদস্যসহ আইনের অধীনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘সরল বিশ্বাসে’ করা কর্মকাণ্ডের জন্য যেকোনো ধরনের ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা থেকে যে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’—এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় খসড়া আইনটি ঢেলে সাজানো ছাড়া অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন ও নিপীড়নমূলক ভূবনে পরিণত হবে। সেখানে জনগণের অভিগম্যতা সরকারের মর্জিমাফিক নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভিন্নমত দমনসহ মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে।’
সবশেষে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সব নাগরিকের সাইবার সুরক্ষার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দেয় টিআইবি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে খসড়া আইনটি ঢেলে সাজানোর জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
