১৭০টি ডিভাইস নিয়ে যেসব ‘অপরাধ’ করতেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের অভিজাত খুলশী এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অনলাইন প্রতারণাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা পুলিশ। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১৭০টি বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র ও কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা ডিজিটাল প্রতারণা, মাদক কারবার, এটিএম জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো, স্বর্ণ চোরাচালান ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।
বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খুলশীর জালালাবাদ এলাকার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি ভবনের অষ্টম তলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।
শুক্রবার বিকেলে দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
উদ্ধার বিপুলসংখ্যক ডিভাইস
পুলিশ জানায়, অভিযানে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কি-বোর্ড, একটি মাউস ও একটি প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি সিমকার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ডও জব্দ করা হয়।
আরও পড়ুন: গারো পাহাড় সীমান্তে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, টহলের খবর পৌঁছে যায় আগেই
পুলিশের ভাষ্য, এসব ডিভাইস অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হতো। জব্দ করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে চক্রটির কর্মকাণ্ড ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
তবে অভিযানে চক্রটির মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দেড় মাস আগে বাসা ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, প্রায় দেড় মাস আগে কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের এক দুবাইপ্রবাসীর বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে অবস্থান শুরু করেন তারা। প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ জানায়, চক্রটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অনলাইন অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন। এসব কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য তাদের দেশি-বিদেশি সহযোগীও রয়েছে।
চক্রটির স্থানীয় সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যেভাবে প্রতারণা চালাত চক্রটি
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি মূলত ‘স্ক্যামিং’-এর সঙ্গে জড়িত। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই স্ক্যামিংয়ের অন্যতম কৌশল।
ভুয়া পরিচয় ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়। কখনো আকর্ষণীয় অফার, চাকরির প্রস্তাব, বিনিয়োগে অস্বাভাবিক লাভের আশ্বাস কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মোবাইল ফোন ও ভুয়া ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এ ধরনের প্রতারণায় ব্যবহৃত হয়।
এক মাস ধরে বিদেশিদের আনাগোনা
খুলশী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, গত এক মাস ধরে ওই আটতলা ভবনে বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা ছিল। তাদের কেউ কেউ নিজেদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
আরও পড়ুন: বরিশালে সমকাল অফিস থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার
পরবর্তী সময়ে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের পাশাপাশি ক্যাসিনোসদৃশ কার্যক্রম পরিচালনার তথ্যও স্থানীয়দের নজরে আসে বলে জানান তিনি।
পুলিশ ধারণা করছে, জব্দ করা ডিভাইসগুলোতে চক্রটির আর্থিক লেনদেন, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অনলাইন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।
বিদেশিদের অপরাধে স্থানীয় সহযোগীদেরও সম্পৃক্ততা
সিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের পর কিছু বিদেশি নাগরিক নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের কেউ কেউ ডিজিটাল প্রতারণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকলেও অর্থ লেনদেন ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগীদের ব্যবহার করছেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতারণার অর্থ সরিয়ে নিতে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাদের সহযোগিতা করছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
তার দাবি, বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশ মাদক কারবার, জাল ডলার ব্যবসা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রবেশের পর কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলেন, যাতে তাদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। পরে রাজধানী বা চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় বাসা ও হোটেল ভাড়া নিয়ে অপরাধের ঘাঁটি গড়ে তোলেন তারা।
তদন্তে বেরিয়ে আসবে চক্রটির পুরো নেটওয়ার্ক
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইসসহ ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে চক্রটির মূলহোতা, স্থানীয় ও বিদেশি সহযোগী এবং তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পুলিশ।
