বাদীকে হুমকি
‘যেভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছি, সেভাবে শাহরানকে হত্যা করব’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলা নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি’ না করতে হুমকি পেয়েছেন মামলার বাদী ও সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম। হুমকিতে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে সালমানের মতোই তাঁর ভাই শাহরানকে হত্যা করা হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান আলমগীর কুমকুম। এদিন সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি আশরাফুল হক ডনের জামিন শুনানিতে তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে শুনানি শেষে সাংবাদিকদের একটি স্ক্রিনশট দেখান আলমগীর কুমকুম। তাঁর দাবি, সালমানের ভক্ত হিসেবে পরিচিত ‘মামুন’ নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক লাইভের কমেন্টে ‘শাকিল কিবরিয়া (Shakil Kibria)’ নামের একটি আইডি থেকে ওই হুমকি দেওয়া হয়।
ওই কমেন্টে লেখা হয়, ‘মামুন, নীলা চৌধুরীকে বলো সালমানের মৃত্যু নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। তা না হলে আমরা যেভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছি, সেভাবে শাহরানকে (সালমান শাহর ভাই) হত্যা করবো।’
আরও পড়ুন: কাদের-সাদ্দামসহ ৭ নেতার সর্বোচ্চ শাস্তি চায় রাষ্ট্রপক্ষ
আলমগীর কুমকুম বলেন, এ ঘটনায় তিনি রমনা মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করবেন। সালমান শাহ হত্যা মামলাটি রমনা থানায় দায়ের হওয়ায় সেখানেই অভিযোগ জানাবেন বলে জানান তিনি।
ডনের জামিন নামঞ্জুর
এদিন মামলার আসামি আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন শুনানি হয়। তাঁর পক্ষে আইনজীবী তারিকুল ইসলাম জুয়েল জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ডনের জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।
শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন সালমানের ভক্ত হিসেবে পরিচিত ‘মামুন’। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সালমানের ভক্তদের নিয়ে মানববন্ধনের আহ্বান জানাতে ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। সেই লাইভের কমেন্টেই হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে কমেন্টটি মুছে ফেলা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তদন্তের আহ্বান জানিয়ে মামুন বলেন, সালমান শাহকে হত্যার দাবি করে তাঁর ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। ডন গ্রেপ্তারের পর কেন এমন হুমকি দেওয়া হলো, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি মামলায় জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
গত রোববার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সেদিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
১১ জনের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত
চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তাঁর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন সামিরার মা লতিফা হক লিও, আশরাফুল হক ডন, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে আদালত চত্বরে বোমা বিস্ফোরণ, অজ্ঞাত ব্যক্তি উধাও
গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমানের মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি করেন।
তিন দশকের পুরোনো রহস্য
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।
ঘটনাটি তদন্ত করে সিআইডি ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন আবেদন করেন তাঁর বাবা। পরে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে দাখিল করা সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমানের মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনেও নারাজি দেন। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। ২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশে র্যাব তদন্ত থেকে সরে গেলে তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে ৫৪ জনের জবানবন্দি ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে সালমানকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণার কারণে সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন বলে মত দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন। পরে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করা হয়।
২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং মামলার সংশ্লিষ্ট রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি যুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে নতুন করে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।
দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ
সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তাঁর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত ২০ মে তদন্ত কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও পুনরায় ময়নাতদন্তের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। ২৪ মে আদালত দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করলে আদালত তা নথিভুক্ত করেন। পরে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহার নিয়োগসংক্রান্ত অফিস আদেশের অনুলিপি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
