সংগীত যেভাবে মন ও মস্তিষ্ক বদলায়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
অনেকেই গান ছাড়া নিজেদের কল্পনাই করতে পারেন না। কাজের সময় বা বিশ্রামের মুহূর্তে গান যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কারও জন্য এটি দিনের শুরু করার শক্তি, আবার কারও জন্য ক্লান্তি দূর করার উপায়। সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের মস্তিষ্ক, অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই কারণে বিশ্ব সংগীত দিবসকে শুধু গান শোনার দিন হিসেবে নয়, বরং মানব মনের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক বোঝার একটি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবেও দেখা হয়। বিশ্বজুড়ে সংগীতকে ঘিরে উদ্যাপন ও শ্রদ্ধা প্রকাশের এই দিনটি হলো বিশ্ব সংগীত দিবস, যা পালিত হয় ২১ জুন।
সংগীত ও মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্কবিজ্ঞানীদের মতে, গান শোনার সময় মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় হয়। এই সিস্টেম থেকে ডোপামিন নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ, উৎসাহ ও সুখের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। প্রিয় গান শুনলে ডোপামিন বেড়ে যায়, ফলে মন ভালো হয় এবং মানসিক চাপ কমে।
ডোপামিন মানুষের আবেগ, অনুপ্রেরণা ও আনন্দ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংগীত এই হরমোনকে প্রাকৃতিকভাবে উদ্দীপিত করে, যা মুহূর্তেই মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
মেজাজ পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগবেষণায় দেখা গেছে, সংগীত মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা ব্রেন ওয়েভের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ধীর ও সুরেলা সংগীত আলফা তরঙ্গ সক্রিয় করে, যা মানসিক প্রশান্তি ও গভীর আরামের অনুভূতি দেয়। অন্যদিকে দ্রুত তালযুক্ত সংগীত বিটা তরঙ্গ বাড়ায়, যা মনোযোগ, সতর্কতা ও শক্তি বৃদ্ধি করে।
ব্রেন ওয়েভ পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মেজাজও পরিবর্তিত হয়। তাই একই ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের গান শুনে কখনো শান্ত, আবার কখনো উদ্যমী অনুভব করতে পারেন।
স্মৃতি ও আবেগের সংযোগসংগীত আমাদের স্মৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। নির্দিষ্ট একটি গান অনেক সময় অতীতের কোনো ঘটনা বা অনুভূতির স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। এটি ঘটে কারণ সংগীত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশকে সক্রিয় করে, যা স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য দায়ী।
এই কারণে একই গান কারও জন্য আনন্দের স্মৃতি, আবার কারও জন্য বিষণ্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। সংগীত তাই শুধু শোনার বিষয় নয়, বরং অনুভব করার একটি অভিজ্ঞতা।
স্ট্রেস কমাতে সংগীতের ভূমিকাবিশেষজ্ঞদের মতে, সংগীত মানসিক চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায়। ধীর সুরের গান শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমায়, ফলে মন ও শরীর উভয়ই শান্ত থাকে।
কর্টিসল হলো শরীরের স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন। এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সংগীতকে অনেক সময় প্রাকৃতিক থেরাপি বা মিউজিক থেরাপি বলা হয়।
দৈনন্দিন জীবনে সংগীতসংগীত আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকালে দ্রুত তালযুক্ত গান এনার্জি বাড়ায়, কাজের সময় ইনস্ট্রুমেন্টাল বা লোফাই সংগীত মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে, আর রাতে ধীর সুরের গান ঘুমের প্রস্তুতি তৈরি করে।
এইভাবে সংগীত শরীরের অভ্যন্তরীণ ছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
সংগীত শুধু বিনোদন নয়, বরং একটি থেরাপি, অনুভূতি এবং জীবনধারা। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও চাপের মধ্যে সংগীত মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সংগীত গভীরভাবে জড়িত। তাই এই দিনটি শুধু উদ্যাপনের নয়, বরং সংগীতকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগও বটে।
গান শোনা মেজাজ পরিবর্তনের সহজ, প্রাকৃতিক ও শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি। এটি কখনো আনন্দ বাড়ায়, কখনো দুঃখ কমায়, আবার কখনো পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সংগীতকে জীবনের অংশ হিসেবে অনুভব করাই সবচেয়ে বড় উদ্যাপন।
