ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও হচ্ছে না ব্যবহার
মো. আবদুল জলিল রিপন, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি দৃষ্টিনন্দন ফুটওভার ব্রিজ। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত স্কুলছাত্রী মর্জিনার স্মৃতি এবং স্থানীয় ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল এই পারাপার ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য ছিল একটাই- জনসাধারণের নিরাপদ সড়ক পারাপার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো, লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফুটওভার ব্রিজটি এখন প্রায় জনশূন্য। অলসতা ও অসচেতনতার কারণে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, পথচারী এবং রোগীর স্বজনেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজের নিচ দিয়েই মহাসড়ক পার হচ্ছেন, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের এই অংশটি অত্যন্ত জনবহুল ও স্পর্শকাতর এলাকা। ফুটওভার ব্রিজের আশপাশে রয়েছে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চৌদ্দগ্রাম মাধ্যমিক পাইলট বালিকা বিদ্যালয়, চৌদ্দগ্রাম এইচ জে পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চৌদ্দগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে দিয়েই মহাসড়ক পারাপার করছে। পথচারীদের একাংশের দাবি, তাড়াহুড়া ও কয়েক মিনিট সময় বাঁচানোর মানসিকতার কারণেই তারা মাত্র কয়েক গজ দূরের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। অথচ তাদের চোখের সামনেই ছুটে চলছে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন।
শিক্ষার্থীদের এমন আত্মঘাতী আচরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চৌদ্দগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল হোসেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত সচেতন করা হয়। প্রতিদিনের সমাবেশে এবং অভিভাবক সমাবেশেও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের সুফল-কুফল তুলে ধরা হয়। এমনকি স্কুলের দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থী নিচ দিয়ে পারাপার করে। তাদেরকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে অসচেতনতার পাশাপাশি আরেকটি বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও অনেক অসুস্থ, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উঁচু সিঁড়ি বেয়ে ফুটওভার ব্রিজে উঠতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই মহাসড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
হাইওয়ে পুলিশ মিয়াবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, সরকার জনগণের জীবন রক্ষার্থে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করেছে। কিন্তু মানুষ নিজে থেকে সচেতন না হলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। তাদের প্রস্তাব, হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও টহল জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ফুটওভার ব্রিজের নিচ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার নিরুৎসাহিত করতে আইনগত ব্যবস্থা বা জরিমানার বিধান কার্যকর করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুবিধার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি র্যাম্প নির্মাণের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
‘একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না’- এই বহুল প্রচলিত সতর্কবাণী যেন চৌদ্দগ্রামের এই ব্যস্ত মহাসড়কে হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতিদিনের এই ঝুঁকিপূর্ণ ‘মরণখেলা’ বন্ধ করতে হবে পথচারীদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই। আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার আগেই শিক্ষক, অভিভাবক, পুলিশ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সাধারণ মানুষের।
