বুনো শিকারি থেকে ঘরের সঙ্গী, বিড়াল ও মানুষের এক হওয়ার ইতিহাস
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
ছবি: মাহিদুল হোসেন সানি
কুকুরকে যেখানে মানুষের সবচেয়ে পুরনো বন্ধু বলা হয়, সেখানে বিড়ালকে বলা হয় মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান সঙ্গী। বর্তমান বিশ্বে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে বিড়ালের জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই ছোট্ট ও চঞ্চল প্রাণীটি কীভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, তার ইতিহাস ঘাঁটলে মানব সভ্যতার এক দারুণ রূপান্তর চোখে পড়ে।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, প্রাচীন মিশরীয়রাই প্রথম বিড়াল পোষা শুরু করেছিল। তবে ২০০৪ সালে সাইপ্রাস দ্বীপে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এই ধারণা বদলে দেয়। সেখানে প্রায় ৯,৫০০ বছর পুরনো এক মানুষের কবরের পাশে একটি বিড়ালের কঙ্কাল অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১০,০০০ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের ‘ফারটাইল ক্রিসেন্ট’ (Fertile Crescent) অঞ্চলে যখন মানুষ শিকারি জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে কৃষিকাজ শুরু করে, ঠিক তখনই বিড়ালের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সূচনা হয়।
শস্যের গুদাম ও ইঁদুরের উপদ্রব: মানুষ যখন কৃষিজাত ফসল ও শস্য গুদামজাত করতে শুরু করল, সেখানে দল বেঁধে হানা দিল ইঁদুরের দল।
স্বার্থের মিলন: ইঁদুরের খোঁজে সেখানে আগমন ঘটে বুনো আফ্রিকান বুনো বিড়ালের (Felis lybica)। মানুষ দেখল, বিড়াল তাদের ফসল রক্ষা করছে, আর বিড়াল দেখল মানুষের বসতির আশেপাশে সহজেই প্রচুর শিকার মিলছে। এই পারস্পরিক সুবিধাবোধ থেকেই দুই প্রজাতির কাছাকাছি আসা।
বিড়াল ও মানুষের সম্পর্কের সবচেয়ে স্বর্ণযুগ ছিল প্রাচীন মিশর। আনুমানিক ৪,০০০ বছর আগে মিশরীয়রা বিড়ালকে পুরোপুরি গৃহপালিত করে তোলে। মিশরে বিড়াল কেবল একটি সাধারণ প্রাণী ছিল না, বরং তাদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল।
দেবী বাস্টেট: মিশরীয়রা বিড়ালকে ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক মনে করত। তাদের ঘরের সুরক্ষাদাত্রী দেবী 'বাস্টেট'-এর রূপ ছিল বিড়ালের মতো।
মিশরে বিড়াল হত্যা ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। এমনকি কোনো বাড়িতে বিড়াল মারা গেলে শোকের প্রতীক হিসেবে বাড়ির সবাই তাদের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন। মৃত্যুর পর মানুষের মতোই বিড়ালকেও মমি করে সমাহিত করা হতো।
মিশর থেকে বিড়াল ধীরে ধীরে গ্রিস, রোম এবং এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ভাইকিং এবং অন্যান্য সমুদ্রযাত্রীরা তাদের জাহাজে বিড়াল রাখতেন। জাহাজের কাঠ ও নাবিকদের খাবার ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করতে বিড়াল ছিল একমাত্র ভরসা। এই সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমেই বিড়াল মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
ইউরোপের মধ্যযুগে এসে বিড়াল ও মানুষের সম্পর্কে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চার্চের কিছু ভুল ধারণার কারণে বিড়ালকে ডাইনি এবং শয়তানের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। বিশেষ করে কালো বিড়ালদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। লাখ লাখ বিড়ালকে হত্যা করার ফলে ইউরোপে ইঁদুরের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়, যা পরবর্তীকালে 'ব্ল্যাক ডেথ' বা প্লেগ মহামারীর অন্যতম কারণ ছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।
উনিশ শতকের পর থেকে বিড়ালের হারানো গৌরব ফিরে আসে। মানুষ বুঝতে পারে বিড়াল কতটা পরিচ্ছন্ন এবং চমৎকার সঙ্গী হতে পারে। বর্তমানে বিড়াল মানুষের ঘরের সোফা থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের দুনিয়া পর্যন্ত রাজত্ব করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিড়ালের ভিডিও বা 'ক্যাট মিমস' আজ বিশ্বজুড়ে বিনোদনের অন্যতম বড় মাধ্যম।
কুকুরকে মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দিয়ে গৃহপালিত করেছিল, কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো।
বিজ্ঞানীরা রসিকতা করে বলেন, ‘বিড়াল নিজেই মানুষকে পোষ মানিয়েছে।’ তারা মানুষের কাছাকাছি এসেছে নিজের সুবিধায়, কিন্তু বদলে আমাদের দিয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসা আর মানসিক প্রশান্তি। আজ ১০,০০০ বছর পরও বিড়াল ও মানুষের এই আত্মিক টান সমানে বজায় আছে।
