প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখাচ্ছে বাংলাদেশ: এডিবি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাৎসুনাকা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আকিরা মাৎসুনাকা বলেন, শক্তিশালী ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার করা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈরী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করা হয়েছে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে অবস্থান করবে, যা এপ্রিলে দেওয়া পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, ইউটিলিটি এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামের ওপর অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। তবে এটি এপ্রিলের পূর্বাভাসে উল্লেখিত ৮ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। উচ্চ জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, বিনিময় হারের প্রভাব এবং খাদ্য ও সেবা খাতে দ্বিতীয় পর্যায়ের মূল্যস্ফীতির কারণে মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এডিও জুলাই ২০২৬-এর হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর সামষ্টিক-আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, সেবা খাতের স্থিতিশীলতা এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে, যার প্রভাব পড়ছে বেসরকারি ভোগ ব্যয়ের ওপর। একই সঙ্গে দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগের মন্দার কারণে রপ্তানি এবং আমদানি প্রবৃদ্ধিও সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
সরবরাহ ব্যবস্থার দিক থেকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত চাপের মুখে থাকতে পারে। পাশাপাশি সার সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষি খাত। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের প্রভাবে সেবা খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে তুলনামূলক সহনীয় মূল্যস্ফীতি, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা, সুশাসনের উন্নয়ন, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং রেমিট্যান্সে অব্যাহত প্রণোদনা ভোগ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে এডিবি। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে নাও পারে।
প্রতিবেদনে সম্ভাব্য কয়েকটি বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও নৌপরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যা বহিঃখাতের চাপ আরও বাড়াবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়া এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। উচ্চ শুল্ক, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ কিংবা প্রধান অর্থনীতিগুলোর ধীর প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি চাহিদাকে আরো দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারের চাপ, কঠোর বৈদেশিক অর্থায়নের পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিকেও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে এডিবি।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কাজ করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকটির ৬৯টি সদস্য দেশ রয়েছে, যার মধ্যে ৪৯টি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের।
