ইরানের ৯০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার একদিনের মাথায় ফের বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আরো কঠোর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারির পরই এই হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা দ্বিতীয় রাতের অভিযানে ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এক্সে প্রকাশিত এক পোস্টে হামলার ভিডিওও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
সেন্টকমের দাবি, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দেওয়া। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, নৌঘাঁটি এবং সামরিক রসদ অবকাঠামো।
মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, আগের রাতের সফল অভিযানের ধারাবাহিকতায় এই হামলা পরিচালিত হয়েছে।
হামলার পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে। একই ধরনের হামলা আবার হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির উপকূলবর্তী সিরিক, বন্দর আব্বাস, কোনারাক ও চাবাহারসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বন্দর আব্বাসে অন্তত আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পাশাপাশি সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আরো পড়ুন : আমেরিকার হামলায় ইরানের ৮ সেনা নিহত
হামলার পর উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। কাতারও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা রাতভর কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি এই অভিযানকে ‘চুক্তিভঙ্গকারী আমেরিকার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জবাবের প্রথম ধাপ’ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলের অন্য মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করার পর এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশের ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় একটি ভবন ও রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর শহরের আকাশে ধোঁয়া দেখা যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, এ ঘটনায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
অন্যদিকে চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বুশেহরে আইআরজিসির একটি ব্যারাক ও কার্যালয়ে আগুন লাগার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিচ্ছিন্ন হওয়া তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি পুনরায় চালু করা হয়েছে এবং বাকি লাইনটিও দ্রুত সচল করা হবে।
বুধবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অত্যন্ত কঠোরভাবে আঘাত করেছে এবং ইরান যতবার হামলা চালাবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ২০ গুণ বেশি জবাব দেবে।
তিনি আরো দাবি করেন, ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ইরান কোনো চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, গত মাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত ভেঙে গেছে। তাঁর ভাষায়, নতুন করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এখন ‘সময়ের অপচয়’।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা অশ্লীলতার জবাব অশ্লীলতায় দিই না; আমরা কাজের মাধ্যমে নির্ভীক ও বীরত্বের সঙ্গে জবাব দিই।’
উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ১৪টি বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছিল। এর মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও ছিল। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দুই দেশ।
এর আগে ২৬ জুন হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে এবং ২৭ জুন একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছিল। মাসের শেষ দিকে উভয় পক্ষ পরিস্থিতি শান্ত রাখার বিষয়ে সম্মত হলেও সেই সমঝোতা আর টেকেনি।
