রয়টার্সের প্রতিবেদন
মধ্যস্থতার টেবিল থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়াতে পারে পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
ছবি: এআই নির্মিত
মার্কিন-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার ভূমিকায় ছিল পাকিস্তান। কিন্তু সেই ভূমিকাই এখন উল্টো ইসলামাবাদের জন্য বড় সংকট হয়ে উঠছে। হুতিদের সৌদি আরবে নতুন হামলার পর প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানও সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী থেকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার দ্বৈত চাপের মুখে পড়েছে দেশটি।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসলামাবাদ। এই চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যে এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমানসহ হাজার হাজার পাকিস্তানি সৈন্য সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি ভূখণ্ডে ইরানের হামলার ঘটনায় পাকিস্তান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, চলতি সপ্তাহের এই নতুন হামলা ইরানের ওপর ইসলামাবাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগকে এক নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কারণ, এটি নতুন করে সৌদি-হুতি যুদ্ধ শুরুর জোরালো শঙ্কা তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: ইরানের কাছে আরও অর্থ-সমরাস্ত্র সহায়তা চেয়েছে হামাস
সোমবার (১৩ জুলাই) ইয়েমেনের হুতিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরবের বোমাবর্ষণের অভিযোগ তোলে। এর জবাবে তারা সৌদি আরব লক্ষ্য করে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই আন্তঃসীমান্ত হামলার মাধ্যমে দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানের উচ্চপর্যায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলা পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এটি আমাদের জন্য রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমারেখা।’
এদিকে পাকিস্তানের প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা যে এত দ্রুত ও হঠাৎ করে বেড়ে যাবে, তা পাকিস্তান আগে থেকে ধারণা করতে পারেনি।’
মূলত দুটি কারণে পাকিস্তানের এই উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে হুতিদের এই সরাসরি সম্পৃক্ততা পাকিস্তানকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। কারণ ইয়েমেন সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা তাদের সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ওপর পাকিস্তানের আমদানি-রপ্তানি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্তানুযায়ী পাকিস্তান সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে।
পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গোলাম মুস্তফা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আপাতত পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে হুতিরা যদি তাদের হামলার পরিধি আরও বাড়ায়, তবে পাকিস্তানের এই অবস্থান বদলে যেতে পারে।’
অন্যদিকে, ইরানি নেতৃত্বের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ইসলামাবাদকে ভাবিয়ে তুলছে। পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দেশটির ক্ষমতাধর সামরিক শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মতপার্থক্য ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে।
বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী জানান, ইরানি প্রশাসনে এখন কূটনীতির চেয়ে সামরিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পাচ্ছে, যা পাকিস্তান খুব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। এই উত্তেজনার কারণে গত সপ্তাহে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দলের ইসলামাবাদ সফর দুই দিন পিছিয়ে যায়। বুধবার (১৫ জুলাই) তারা পাকিস্তানে পৌঁছান এবং ধারণা করা হচ্ছে মার্কিন-ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি এক বিবৃতিতে জানান, পাকিস্তান সব পক্ষকে সর্বোচ্চসংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো সংকট সমাধানে নিয়মিত যোগাযোগ, সংলাপ এবং কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বড় ভূমিকা নিতে চাইলেও এর নিজস্ব কিছু অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। দেশটি জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জন্য সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, যার ফলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। ফলে মার্কিন-ইরান বিরোধ মেটানো পাকিস্তানের জন্য কেবল কূটনৈতিক বিষয় নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি। মধ্যস্থতার সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের আরেকটি সূত্র স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ‘আমরা যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে। তবে সৌদি আরব যদি আমাদের সামরিক সহায়তা চায়, আমরা কোনো দ্বিধা ছাড়া তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব।’
