যেভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরিম (মায়ুন) দ্বীপ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দখলে নেয় তারা। এর আগের দিন ঐতিহাসিক কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা (আল-মাখা) দখল করে হুতি বাহিনী।
একাধিক সূত্রের বরাতে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, শুক্রবার হুতি যোদ্ধারা ধুবাব শহরের দিকে অগ্রসর হলে সৌদি আরব-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী পেরিম দ্বীপ ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এই দখলের মধ্য দিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে ইউরোপ-এশিয়ার নৌ-বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবেও চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌসংযোগস্থল এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরানও কৌশলগতভাবে বাড়তি দর-কষাকষির সুযোগ পেতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার মধ্যে সৌদি আরব তার প্রায় ২০ শতাংশ তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরপথের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করছিল। পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে হুতিরা এখন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি বা নৌপথে বড় ধরনের হুমকি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও। ঘটনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত মে মাসের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে।

সৌদি তেল অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ
এদিকে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের কৌশলগত পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বরাবর প্রায় ৬০ মাইল দীর্ঘ ধোঁয়ার কুণ্ডলী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ তেল পরিবহন অবকাঠামোয় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকার কিংবা হুতিদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ সতর্ক করে বলেছেন, হুতিরা এখন সৌদি নিরাপত্তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত গভীরতা—একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। তার মতে, এর প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
‘বাণিজ্যিক নৌচলাচল নিরাপদ’
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নাকচ করেছেন হুতি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুসসালাম। এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌচলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। এ অঞ্চল নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

এক সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত ৪৬ হাজারের বেশি
অন্যদিকে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সংঘাতের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
শুক্রবার সংস্থাটি জানায়, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও তাইজ গভর্নরেটে তীব্র সংঘাতের কারণে মাত্র এক সপ্তাহে ৪৬ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ইয়েমেনে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি।
