পিছু হটলো হতচকিত বিএনপি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৩, ০৯:৩১ এএম
ফাইল ছবি
> ক্ষুব্ধ বেশির ভাগ নেতাকর্মী সমর্থক ও সমমনারা > মাঠে ছিলেন না সিনিয়র নেতারা
আন্দোলন তুঙ্গে তুলে আবারো পিছু হটলো বিএনপি। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে থাকা বিএনপির এমন পিছু হটা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশা। পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও চলছে নানান তর্ক-বিতর্ক। দলটির নেতৃত্বের যোগ্যতা, দূরদর্র্শিতা ও আন্তরিকতা নিয়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী সমর্থক ও সমমনারা।
সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনে সমমনাদের নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। ধীরে ধীরে আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি দেবে- এমন ধারণা দলটির সব পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি সমমনাদেরও। কিন্ত হঠাৎ করে ২৭ জুলাই বৃহস্পতিবার মহাসমাবেশ ডেকে বসায় দলটির অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন কীসের ভিত্তিতে এমন চূড়ান্ত কর্মসূচি। কেনই বা তড়িঘড়ি করে এমন ঘোষণা। ২২ জুলাই রাজধানীতে তারুণ্যের সমাবেশের পর এমন বড় কর্মসূচি দেয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়। এত অল্প সময়ে এমন কর্মসূচির সফলতা নিয়েও সন্দেহ দেখা দেয়। পুলিশের অনুমতি না মেলায় একদিন পিছিয়ে ২৮ জুলাই মহাসমাবেশ সরিয়ে নেয়া ‘স্মার্ট সিদ্ধান্ত’ বলে মনে করেন অনেকেই।
মহাসমাবেশ থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত কর্মসূচি আসছে- দলীয় নেতাকর্মীদের এমন ধারণায় ব্যত্যয় ঘটে রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণায়। মহাসমাবেশ থেকে অনেকটা হতাশ হয়েই ফিরে নেতাকর্মীরা। এ কারণে আগের দিন মহাসমাবেশে যেসব নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন তাদের বিশাল একটি অংশ গতকালের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। রাজধানী ঢাকার উত্তর দক্ষিণ কমিটিসহ বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটির নেতারাও কর্মসূচিতে অংশ নেননি। তেমনি ঢাকার বাইরে থেকে আসা নেতাদের ঢাকায় থেকে যেতে নির্দেশ দেয়া হলেও অনেকেই নিজ এলাকায় ফিরে যান। যারা ঢাকায় ছিলেন তারাও কর্মসূচিতে অংশ নেননি হতাশা থেকেই। হতাশা আরো গভীর হয় শনিবার।
দিনভর উত্তপ্ত ছিল রাজধানী ঢাকা। গাবতলী, মাতুয়াইল, ধোলাইপাড় ও উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ ঘটেছে। অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন। মামলার আসামি হয়েছেন। কিন্তু এদিন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম আজাদ ও সুলতান সালাউদ্দীন টুকু ছাড়া অন্যদের রাজপথে দেখা যায়নি। এদের মধ্যে গয়েশ্বর আহত হয়েছেন, আমান অসুস্থ হয়েছেন, সালাম গ্রেপ্তার হয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচিতে স্লোগানে বোল ধরা যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দীন টুকু পুলিশ দেখে ভো দৌড় দেন- যে ভিডিও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। বাকিদের মধ্যে উত্তরা বিএনএস সেন্টার উল্টো দিকের রাস্তার ডক্টর আব্দুল মঈন খানকে দেখা যায়নি।
গাবতলী এস এ খালেক বাস স্টেশনের সামনে নজরুল ইসলাম খান, যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাই ওভার থেকে নেমে চট্টগ্রাম রোড দনিয়া কলেজ সংলগ্নস্থানে মির্জা আব্বাস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম, কেন্দ্রীয় বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদসহ সিনিয়র কোনো নেতাকে রাজপথে কর্মীদের সঙ্গ দিতে দেখা যায়নি। পাশাাশি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমান উল্লাহ আমানকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও ডিবি প্রধানের আপ্যায়ন সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির বাস্তবতায় বিএনপি মহাসচিবকে এ নিয়ে বক্তব্য দিতে হয়েছে।
বিএনপির প্রতি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের অবদান বা কমিটমেন্ট প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি তার সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। পাশাপাশি আমান উল্লাহ আমানকেও প্রমাণ করতে হবে না- দেশের রাজনীতি, দলের প্রতি এবং জনগণের প্রতি তার কোনো ঘাটতি আছে। এসব কারণে দলীয় নেতাকর্মীরা অনেক বেশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির মাঠ পর্যায়ের এক নেতা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কর্মীদের মাঠে নামিয়ে নেতারা এসি রুমে বসে টিভি দেখেন। তার ভাষায়, আবারো ২০১৪-২০১৫ সালের মত একটি নিষ্ফল আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন নেতারা। যুবদলের এক নেতা সুলতান সালাউদ্দীন টুকুর নাম উল্লেখ করে বলেন, পুলিশ দেখে যে দৌড় দেয় তাকে নেতা বানালে আন্দোলনের ফলাফল ব্যর্থ হতে বাধ্য। তার মতে, এমন নেতাদের এখনই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত।
নেতারা ঝুঁকি নিতে পারেন না উল্লেখ করে যুবদলের এই নেতা বলেন, সাহসের অভাবে গত ২৮ জুলাই মহাসমাবেশের দিন সকালে পুলিশ যখন ১০ মিনিটের মধ্যে বিএনপি অফিসের সামনের রাস্তা খালি করে দেয়ার আল্টিমেটাম দেয় তখন ৫ মিনিটের মধ্যে রাস্তা খালি হয়ে যায়। এটা থেকে বোঝা যায় বিএনপি কি আন্দোলন করবে। তার মতে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধারণা ছিল মার্কিন ভিসানীতির কারণে পুলিশ হয়তো নমনীয় অবস্থান নেবে। এতটা মারমুখী হবে তা ধারণার বাইরে ছিল তাদের। এ কারণে রাস্তায় নেমে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের কঠোর অবস্থান দেখে হতচকিত হয়ে পড়েন বিএনপি নেতাকর্মীরা। কয়েক স্থানে তারা সংঘর্ষে জড়ালেও পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে অনেকে নিরাপদে সটকে পড়েন।
এদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আজ সোমবার আবার জনসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হবে বিকাল ৩টায়। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখান থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। জানা গেছে, আবারো আল্টিমেটামসহ রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে কর্মসূচি আসবে। তবে কী কর্মসূচি আসছে তা জানাতে পারছে না বিএনপির কোনো সূত্র। সমমনারাও জানেন না নতুন কর্মসূচি। কর্মসূচির বিষয়টি একমাত্র লন্ডনে পরাতক তারেক রহমানই জানেন বলে জনিয়েছে দলের একটি সূত্র। সূত্রের মতে, মহাসচিব বক্তব্য রাখার পূর্ব মুহুতেই তারেক রহমান নতুন কর্মসূচি মহাসচিবকে অবহিত করেন। এরপর মহাসচিব তা ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে সমমনা দল বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডাক্তার মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ভোরের কাগজকে বলেন, ধারাবাহিক কর্মসূচি দিলে নেতাকর্মীরা অসুস্থ হয়ে পরবেন। তাদের বিশ্রাম প্রয়োজন; এ কারণে কর্মসূচিতে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে। আন্দোলন নিয়ে যাদের ধারণা নেই তারা অনেক কথা বলবে। তিনি বলেন, ঢাকাকে ঘিরেই নতুন কর্মসূচি আসছে।
