ফোন নম্বরের সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উদঘাটন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৩৫ এএম
৫ বছর ধরে হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু না পাওয়ায় ফাইনাল রিপোর্ট দেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক এ সময় শেষবারের মতো তদন্তে নেমে পাওয়া যায় একটি মোবাইল ফোনের নম্বর। পরে ওই ফোন নম্বরের সূত্র ধরে আটক করা হয় এক ব্যক্তিকে। ওই ব্যক্তি পুলিশকে জানান, এটি তার ছেলের নম্বর। এরপর তার ছেলেকে আটক করা হয়। তিনি পুলিশকে জানান, দেড় মাস আগে তার ওই মোবাইল ছিনতাই করেছে স্থানীয় এক ছিনতাইকারী। সঙ্গে সঙ্গে ওই ছিনতাইকারীকে আটক করে পুলিশ। পরে তার দেয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে হত্যার রহস্য। গ্রেপ্তার করা হয় জড়িত আরো দুজনকে।
২০১৪ সালে ১৪ নভেম্বর রাজধানীর ডেমরার সানারপাড়ে শিকোটেক্স গার্মেন্টসের আয়রনম্যান মো. খতিব মিয়া (২০) হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন তারা। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, মো. আলমগীর হোসেন ওরফে ফরমা আলমগীর, মো. হৃদয় ও মোহাম্মদ হোসেন ডালী ওরফে মামুন। গত শুক্রবার রাজধানীর ধলপুরের সুতিখালপাড় থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আলমগীরকে। পরে তার দেয়া তথ্যে, শনিবার সানাড়পাড় থেকে হৃদয় ও সোমবার সুতিখালপাড় থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা।
সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিট সূত্র জানায়, ৫ বছর পর হত্যা মামলাটির তদন্তে নেমে প্রথমেই বের করা হয় হত্যার পরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া সংবাদ। সেখান থেকে ছিনতাইয়ের বিষয়টি অনুমান করলে ডেমরা এলাকার স্থানীয় একটি নিউজ পোর্টালে দেখা যায়, পুলিশের উঠান বৈঠকে স্থানীয়রা তৎকালীন ডেমরা থানার ওসি ও ওয়ারী বিভাগের ডিসিকে ছিনতাইকারী চক্রের মূলহোতা আলমগীর সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন। পরে আলমগীর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেমরা এলাকার ছিনতাই চক্রের মূলহোতা সে। দিনে ডেমরা থানার ইনফর্মার এবং রাতে ছিনতাই করে সে। পরে সোর্সের মাধ্যমে
আলমগীরের নম্বর পাওয়া গেলেও কোনো কূলকিনারা হচ্ছিল না। এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ওই নম্বরে বেশি কথা হয়েছে এমন একটি নম্বর চিহ্নিত করে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ব্যক্তি জানান, নাম্বারটি তার ছেলে সাদিদের (ছদ্মনাম)। সাদিদকে আটক করা হলে তিনি জানান, দেড় মাস আগে স্থানীয় ছিনতাইকারী আলমগীর তার মোবাইল ছিনতাই করে। পরে সাদিদকে সঙ্গে নিয়ে আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু মোবাইল নম্বরটির খোঁজ মিলছিল না। ওই নম্বরের মোবাইল কোথায় জানতে চাইলে আলমগীর জানান, জুয়া খেলে খুইয়ে ফেলেছেন। পরে ওই নম্বরের সিমসহ মোবাইলটি জব্দ করা হয়।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, ২০১৪ সালের ১৪ নভেম্বর রাতে কালাম নামের একজনের বাসায় ইয়াবা সেবন করে আলমগীর, মামুন ও হৃদয়। ইয়াবা সেবন শেষে আলমগীর ও হৃদয় ওই বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে দেখতে পায় খতিব নারায়ণগঞ্জ থেকে সানারপাড় রাস্তার দিকে হেঁটে আসছে। পরে তারা খতিবের রাস্তা রোধ করে হাতে থাকা ব্যাগ নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু খতিব ব্যাগ না দিয়ে হৃদয়কে ঝাপটে ধরে চিৎকার করতে থাকে। এতে লোক জড়ো হওয়ার ভয়ে হৃদয় পকেটে থাকা সুইচগিয়ার দিয়ে ৩টা কোপ দেয় খতিবকে। তাতেও খতিব ভয় না পেয়ে আরো জোড়ে চিৎকার করতে থাকে এবং আলমগীর ও হৃদয়কে ঝাপটে ধরে রাখে। এ সময় মামুন দৌড়ে এসে খতিবের থুতনির নিচের অংশে ছুরি ঢুকিয়ে দিলে নিহত হন খতিব। পরে তারা সানারপাড় এলাকার কেনালপাড় ওয়ালের নিচে ওই ছুরি লুকিয়ে রেখে পালিয়ে যায়।
সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিটের শুটিং ইনসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের সহকারী পুলিশ কমিশনার আশরাফউল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেন, খতিব হত্যার দিনই ডেমরা থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়। পরে মামলাটি ডিবিতে স্থান্তর করা হয়। কিন্তু ৫ বছরেও কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। ক্লুলেস এই মামলার তদন্তে অবশেষে একটি ফোন নম্বরের সূত্র ধরে খুনিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামিরা। পরে আদালতের নির্দেশে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
