আজ কালী পূজা, মধ্যনগরে ব্যাপক আয়োজন
মধ্যনগর (সুুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব কালী পূজা আজ (৩১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হবে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ও পাড়ায় এ উপলক্ষে বইছে আনন্দের বন্যা।
উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিদ্যুৎ কুমার সরকার জানান, মধ্যনগর উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রায় সব গ্রামেই কার্তিক মাসের অমবস্যা তিথিতে সাধারণত শ্যামা পূজা বা কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কালী পূজার দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে স্বর্গীয় পিতা—মাতা ও আত্মীয়—স্বজনদের স্মরণ করেন। এটিকে বলা হয় দীপাবলী।
কালী শব্দটি তৈরি হচ্ছে কাল ধাতু প্রত্যয় যুক্ত হয়ে। কাল অর্থে সময়, এই সময়কে চোখে দেখা যায় না। তাই কালী হলেন- কালো বা ঘন নীল। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিনটি কাল নিয়েই হলো মহাকাল। আর সেই মহাকালের আদি শক্তি কালী, দশমহাবিদ্যা তারই প্রথম রূপ।
পুরাণ অনুসারে, সৃষ্টির শুরুতে শ্রীবিষ্ণু তখন যোগনিদ্রায় মগ্ন ছিলেন। সেই সময় বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে উৎপত্তি হয় প্রজাপতি ব্রহ্মার। এই সময় বিষ্ণুর কর্ণকমল থেকে দুটি দৈত্যের জন্ম হয়। এই দুই দৈত্যের নাম ছিল মধু ও কৈটভ। মধু ও কৈটভ নামে এই দুই দৈত্য ব্রহ্মাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। তখন ব্রহ্মা মহাকালীর স্তব শুরু করেন। ভক্তের ডাকে আদ্যা শক্তি মহামায়া কালী রূপে আবির্ভূতা হন।
আবার মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুসারে, শ্রী শ্রী চন্ডীতে বলা আছে যে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই দৈত্যের অত্যাচারে ভীত দেবতাগণ নিজেদের রক্ষা করতে ও সৃষ্টিকে বাঁচাতে আদ্যাশক্তির আরাধনা শুরু করেন। তখন আদ্যাশক্তির দেহকোষ থেকে আবির্ভূতা হন দেবী অম্বিকা। তিনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হওয়ায় তার অপর নাম কালী।
আবার ত্রেতা যুগে রাবণের পুত্র মহিলা বোনের সাধনায় তুষ্ট হয়ে তিনি ভদ্রকালী রূপে পূজিতা হন। এই দেবী হলেন পরম করুণাময়ী, তার কাছে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই, যে তাকে আকুল হয়ে ডাকবে, তাকেই রক্ষা করতে দেবী আবির্ভূতা হবেন। দেবতা, দৈত্য বা মানুষ যিনিই তার শরণ নেবেন, তার ডাকেই সাড়া দেবেন মহামায়া। মা কালীকে ঘিরে নানা লোককথাও প্রচলিত।
মা কালীর বিভিন্ন রূপ রয়েছে। কোথাও তিনি ভদ্রকালী, কোথাও তিনি রক্ষাকালী, কোথাও আবার শ্মশানকালী, কোথাও আবার তিনি শকুন্তলা কালী। এ ছাড়া ভক্তদের ডাকে তিনি কখনও খ্যাপা কালী, কখনও নিশি কালী, কখনও ডাকাত কালী, কখনও সিদ্ধেশ্বরী কালী, আবার কখনও করুণাময়ী কালী রূপে আবির্ভূতা এবং পূজিতা হন। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী, কালীঘাটের মা কালীসহ ভারতবর্ষ ও গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই দক্ষিণা কালী রূপে তার পুজো হয়। কালীমূর্তির দক্ষিণ পদ মহাদেবের বুকে আগে থাকলে তিনি হলেন দক্ষিণা কালী। আবার কালীমূর্তির বাম চরণ মহাদেবের বুকে আগে থাকলে তখন তিনি বামাকালী রূপে পূজিতা হন। বেদান্তের মু—ক উপনিষদে মা কালীর যে পরিচয় পাওয়া যায়, সেখানে করালি মা কালী যেন অগ্নির লকলকে সাতটি জিহ্বা।
ষোড়শ শতকের বিখ্যাত পন্ডিত ও তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মূর্তি রূপে প্রথম দক্ষিণা কালীর পূজার প্রচলন করেন। তার আগে তন্ত্রে বা ঘটে কালীর পূজা সম্পন্ন হত। করালবদনা কালী মানুষের বিপদ দুঃখ অশান্তি যন্ত্রণা দূর করেন বলে ভক্তের মনে বিশ্বাস। সেই কারণে সংসারী মানুষ সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কালীপুজো করে থাকেন। কালী পূজার মূলাধার হল ভক্তি। ভক্তি সাগরে ভেসে মায়ের চরণে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিবেদন করতে হয়। এই কারণে রামপ্রসাদের গানে বলা হয়েছে ‘আর কাজ কী আমার কাশী,মায়ের পদতলে পড়ে আছে গয়া গঙ্গা বারাণসী।’
এদিকে মধ্যনগরের আদিবাসী হাজং ও বানাই নৃগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও এ দুই আদিবাসী সম্প্রদায়ের শ্যামা পূজা বা কালী পূজা উদযাপনের ধরনটি ভিন্ন।
আদিবাসী হাজং সম্প্রদায়ের দশরথ চন্দ্র অধিকারী জানান, এ পূজা উপলক্ষে আদিবাসী যুবক-যুবতীরা নানান রংয়ের মুখোশ পড়ে বর্ণীল সাজে নিজস্ব ভাষায় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে চাল ডাল সহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী বা নগদ অর্থ সংগ্রহ করে। আদিবাসী সংস্কৃতির এ পর্বটি চরমাগা নামে পরিচিত। এর পর পূজার দিন সংগ্রহীত টাকা ও খাদ্য সামগ্রী দিয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে সুস্বাদু খাবার তৈরি করে সকলের মাঝে বিতরণ করা হয়। তবে দিনে দিনে নামান প্রতিকূল পরিস্থিতির কারনে আগের উৎসবের আমেজ হারাতে বসেছে। তবু সংক্ষিপ্ত আকারে আদিবাসী হাজং ও বানাই নৃগোষ্ঠী এবছরও শ্যামা পূজা বা কালী পূজা পালন করছেন।
মধ্যনগরের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তি ও বিএনপি নেতা বাদল চন্দ্র সরকার বলেন, শান্তি পূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শ্যামা পূজা বা কালী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
