অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর ভাগ্যে কী আছে?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা স্পর্শকাতর একাধিক অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে বলে জানিয়েছে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। অন্যদিকে, আলোচিত দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বহাল রেখে সেটিকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে সরকারের পক্ষ থেকে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক জানান, এত অল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশ জারি হওয়া নজিরবিহীন, গড়ে প্রতিটি অধ্যাদেশ জারিতে পাঁচ দিনেরও কম সময় লেগেছে।
নতুন বা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ বসবে। শাহদীন মালিক বলেন, সংসদ বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ আইন আকারে অনুমোদন পাবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মৃত’ বা বাতিল হয়ে যাবে।
যদিও বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সব অধ্যাদেশ তারা পর্যালোচনা করছে। তবে কোনগুলোকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়নি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আপত্তির জায়গা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের তিনদিন পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সে সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ওই সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বড় রাজনৈতিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশ নিয়ে শুরু থেকেই বিএনপির আপত্তি ছিল। দলটি এমন আদেশ জারির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করলেও বিএনপি তাদের আগের অবস্থানেই রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে দেখা গেছে, বিএনপি ও তাদের মিত্র দলের ২১২ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও জামায়াত ও এনসিপি জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন।
আরো পড়ুন : ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত কেবিনেটের বাইরে হতো’
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনও অপরিবর্তিত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা হবে।
আইনজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়েছে। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি নতুন বাস্তবতায় এসেছে।
শাহদীন মালিক বলেন, অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের কোনো অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। সেখানে বেশকিছু অধ্যাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের অধ্যাদেশ উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্পর্শকাতর অন্যান্য অধ্যাদেশ
বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গণভোট, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর করা এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সরকারের অন্য সূত্রগুলো বলছে, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং অত্যাবশ্যকীয় কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করে সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে।
আইনজ্ঞদের মতে, সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, শেষ পর্যন্ত কতগুলো অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দায়মুক্তি অধ্যাদেশে আপত্তি কম
সবচেয়ে আলোচিত অধ্যাদেশগুলোর একটি ছিল ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, যা ২৫ জানুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে জারি করা হয়।
এ অধ্যাদেশে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা নির্ধারিত বিধান অনুসারে প্রত্যাহার করা হবে এবং নতুন মামলা গ্রহণ আইনত বাধাপ্রাপ্ত হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া সংবিধান পরিপন্থি। তবে আন্দোলনকারীরা এসব সমালোচনার বিরোধিতা করেন।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তরা চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো এতে সন্তুষ্ট নয়। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, দায়মুক্তির অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন, ১৪০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আবেগ-অনুভূতির বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্য দলগুলোও দায়মুক্তির অধ্যাদেশের পক্ষে। ফলে এটি আইনি ভিত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুলিশ হত্যার ঘটনা আলাদাভাবে তদন্তের কথাও ভাবা হচ্ছে।
শাহদীন মালিকের মতে, সংসদে অনুমোদন পেলেও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে দায়মুক্তি অধ্যাদেশের আইনগত বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
গণভোট ও অন্যান্য প্রশ্ন
সংবিধান সংস্কার নিয়ে গণভোট প্রশ্নে নির্বাচনের আগে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট ছিল না বলে অভিযোগ তুলেছিল অন্য দলগুলো। তবে নির্বাচনী প্রচারণার এক পর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন।
বর্তমানে গণভোট-সম্পর্কিত অধ্যাদেশের বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে একধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটের বিপক্ষে বিএনপি যেতে পারবে না বলেও তারা মনে করেন।
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশ জারির সময় বিএনপি বা অন্য দলগুলোর আপত্তি ছিল না। তবে এখন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে কতটা সুযোগ দেওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার বিষয়টি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান এখনও জানানো হয়নি।
সরকারি চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর অধ্যাদেশ বাতিল করা হলে তরুণদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সামনে কী?
আইনজ্ঞদের মতে, যেসব অধ্যাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অনেক অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। ফলে সামগ্রিকভাবে জটিলতা রয়েছে।
বিএনপি সরকারের সূত্রগুলোও বলছে, প্রেক্ষাপট, বাস্তবতা ও আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি পাবে না, সেগুলোর অধীনে গৃহীত কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরেই নির্ধারিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর চূড়ান্ত ভাগ্য।
