'ভাড়াটে সৈন্য' হিসেবে রাশিয়ার পক্ষে লড়ছে বাংলাদেশি তরুণরা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পারব, এটা কল্পনাও করতে পারিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা মোহন মিয়াজি। মিয়াজি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, চারিদিকে শুধু লাশ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই মানুষ মরে পড়ে আছে। ফ্রন্টলাইন মানে প্রতিটা সেকেন্ডেই মৃত্যুর ভয়। সবসময় গুলি, আর্টিলারি, ড্রোন হামলা চলতে থাকে, যেখানে-সেখানে ল্যান্ডমাইন। হাঁটার সময় একটু এদিক-সেদিক হলেই মাইন বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণ চলে যেতে পারে।
তিনি জানান, তার বন্ধু আশিকুরও প্রাণ হারিয়েছেন। আমার বন্ধু আশিকুর, নোয়াখালির, ওর বাড়ি। সে আমার সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধ গিয়েছিল। কয়েক মাস আগে ও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে।
খাবারের কষ্ট নিয়েও তিনি বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে প্রায়ই খাবার পৌঁছাতে সমস্যা হয়। তখন দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়।
মিয়াজি সম্প্রতি রুশ সৈন্যশিবির থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। সেনাক্যাম্পের চারপাশে সবসময় কড়া গার্ড থাকে। পালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু আমার কিছুদিনের ছুটি ছিল। তখন ক্যাম্পের বাইরে এসে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির সহায়তায় দেশে ফিরেছি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এখনও অনেক নাগরিক রাশিয়ার পক্ষে লড়ছেন। সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্বও বরণ করছেন কেউ কেউ। কেউ মাসের পর মাস খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
কীভাবে বাংলাদেশের নাগরিকরা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে
বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষদের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করছে একটি দালাল চক্র। চক্রটির সঙ্গে দু’জন ভারতীয় নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্য এসেছে। পড়াশোনা বা কাজের সুবাদে রাশিয়া যাওয়া কিছু মানুষও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন।
মোহন মিয়াজি প্রথমে চীনা একটি তেল-গ্যাস কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কয়েক মাস পরে চাকরি ছেড়ে দেন। সহকর্মী সোহেলের উৎসাহে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সোহেল হটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে যুদ্ধের ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করেন এবং সবাইকে উৎসাহিত করেন।
সোহেল বলেছিল, সেখানে সে ভালো আছে। তাকে সরাসরি যুদ্ধে যেতে হয়নি। ক্যাম্পেই বিভিন্ন কাজ করে। আমরা যোগ দিলে আমাদেরও যুদ্ধ পাঠানো হবে না। সেজন্য রাজি হয়েছিলাম, বলেন মিয়াজি।
কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, ক্যাম্পে কমান্ডারকে আমি সব স্কিল দেখাই, কিন্তু তারা বলল, চুক্তি অনুযায়ী আপনাকে যুদ্ধে পাঠাতে হবে। ওই রুশ নারী আমাকে প্রতারণা করেছে।
অন্যান্য বাংলাদেশি তরুণও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সাবেক সেনা সদস্য নজরুল ইসলামও ফার্নিচার কোম্পানির চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া গিয়েছিলেন, পরে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। স্ত্রী আইরিন আক্তার বলেন, দালালরা বলেছিল, যুদ্ধে যেতে হবে না। কিন্তু পরে বাধ্য করা হয়।
আরো পড়ুন : সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ভারত
মধ্যপ্রাচ্য হয়ে রাশিয়া
ভুক্তভোগীদের প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে নেওয়া হয়, তারপর রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে জোর করে চুক্তি স্বাক্ষর করানো হয়। চুক্তি রুশ ভাষায় ছিল। স্বাক্ষরের আগে কেউ বিষয়বস্তু বুঝতে পারেনি।
চুক্তি অনুযায়ী রুশ সরকার এককালীন অর্থ ও মাসিক বেতন দেয়, তবে দালালরা অর্থের বড় অংশ নিজেদের পকেটে নিয়েছে। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি।
দালাল চক্র ও ট্রাভেল এজেন্সি
ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগকে ‘বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’ এর মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। নতুন দলে বাংলাদেশি পাঠানোর পরিকল্পনা এখনও চলছে। চক্রের প্রধান কার্যালয় ঢাকার মালিবাগ মোড়ে অবস্থিত। পুলিশের (সিআইডি) তদন্তে বেশ কয়েকজন দালাল গ্রেপ্তার হলেও চক্রের মূল প্রধান এখনও সক্রিয়।
ভুক্তভোগিদের পরিবারের দাবি, রাশিয়ায় নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। নতুন করে কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে না পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশের পদক্ষেপ
জোর করে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে নেমে তারা একাধিক দালাল চক্রের সন্ধান পেয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, আমাদের সিআইডির একটা ডেডিকেটেড টিম কিন্তু এটা নিয়ে কাজ করছে। আমরা কিছু ডিটেক্ট করে ফেলেছি এর মধ্যে, অ্যারেস্টও। এ ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত কমিটেড, কোনোভাবেই ছাড় দেবো না বিন্দুমাত্র। যারা এই ধরনের আছে, তাদের বিষয়ে আমরা অলরেডি কাজ করছি, বলেন পুলিশের অতিরিক্ত এই মহাপরিদর্শক।
তবে দালালদের যে চক্রটি বিবিসি বাংলা খুঁজে পেয়েছে, তারা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যদিও চক্রটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার মালিবাগ মোড়ে সিআইডি সদরদপ্তরের ঠিক উল্টোপাশের একটি ভবনে অবস্থিত। নাকের ডগায় থাকার পরও সিআইডি কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারলো না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগিরা।
দালাল চক্রের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রুশ সরকার অবহিত কি-না, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের সহায়তা চাচ্ছেন স্বজনরা।
সরকারের তরফ থেকেও বলা হচ্ছে যে, তারা চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু কবে নাগাদ নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরবে কিংবা আদৌ আনা সম্ভব হবে কি-না, সেই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
