×

জাতীয়

কে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী?

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

কে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী?

ছবি: অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

২০২৬ সালের ২৪ মার্চ ভোরে ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় নিজ বাসভবন থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একটি দল গ্রেপ্তার করে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার হত্যাচেষ্টাসহ অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন সেনাবাহিনীর এই সাবেক ‘ত্রি-স্টার’ জেনারেল, যিনি ২০০৭-০৮ সালের সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।

প্রারম্ভিক জীবন সেনাবাহিনীতে উত্থান:  মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৫৪ সালের ৩০ জুন ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তার সামরিক জীবনের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তিনি জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিলেন, যা পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে একীভূত করা হয়। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন এবং প্রতিরক্ষা অধ্যয়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেনাবাহিনীতে তার কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও তিনি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও), ৯ম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং সাভার এরিয়া কমান্ডার, এবং ৩৩ নং পদাতিক ডিভিশনের জিওসি কুমিল্লা এরিয়া কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

আরো পড়ুন: পাঁচ দিনের রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

১/১১ পটপরিবর্তনে ভূমিকা:  মেজর জেনারেল থাকাকালীন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন। এই ঘটনাটি '/১১' বা ‘ওয়ান-ইলাভেন’ নামে পরিচিত, যার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। এই পটপরিবর্তনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হতেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে মেজর জেনারেল থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এই সময়ে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন 'গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি' সমন্বয়ক হিসেবে। এই কমিটির মাধ্যমে সেনাবাহিনী যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার জিজ্ঞাসাবাদ অভিযান পরিচালিত হয়। পর্দার আড়াল থেকে তিনি এই অভিযান নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হত।

এই অভিযানের আওতায় আটকদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারেক রহমান পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাকে জানান যে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশেই তাকে সামরিক হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছিল। এই সময়ে তিনি 'মাস্টারমাইন্ড মাসুদ' নামেও পরিচিতি লাভ করেন।

কূটনৈতিক রাজনৈতিক জীবন:  ২০০৮ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদ তিনবার বাড়িয়ে দেয়। ২০১৪ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে আসার পর অবসর গ্রহণ করেন এবং ঢাকায় পিকাসো রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িত হন।

২০১৮ সালে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং দলটির মনোনয়নে ফেনী- আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টিতে যোগদানের পর তাকে দলের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়াও তিনি বারিধারা কসমোপলিটন ক্লাবের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবন:  মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জেসমিন মাসুদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রীর মাধ্যমে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাই সাইয়ীদ ইস্কান্দরের বোনের সাথে সম্পর্কিত, যা তাকে বিএনপি নেত্রীর সাথে বৈবাহিক সূত্রে যুক্ত করেছে। ২০১৭ সালে তিনি ফেসবুক পোস্টের কারণে আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন।

বিতর্ক গ্রেপ্তার:  ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একটি আদালত তার অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেয়। ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হন এই সাবেক জেনারেল। গ্রেপ্তারের পর ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, তার বিরুদ্ধে পল্টন, বনানী, কোতোয়ালী, মিরপুর হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার, অর্থপাচার, হত্যা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মোট ১১টি মামলা রয়েছে।

তিনি এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। তার বিরুদ্ধে ২৪০ বিলিয়ন টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ডিবি প্রধান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আমরা শুধু সেই অংশগুলো বিবেচনা করি যেখানে তিনি আমাদের কাছে দায়ের করা মামলায় জড়িত।তবে তিনি বলেন যে, কেউ নির্যাতনের শিকার হলে তাদের আইনি সহায়তা চাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং তারা আইনি সহায়তা চাইলে তা স্বাগত জানানো হবে।

সব মিলিয়ে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য এবং বিতর্কিত নাম। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি, যার নির্দেশনায় দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদরা গ্রেপ্তার নির্যাতনের শিকার হন। সেনাবাহিনী থেকে কূটনীতি রাজনীতিতে পদার্পণ করে সংসদ সদস্য হওয়ার পরেও তার বিরুদ্ধে থাকা একাধিক অভিযোগ শেষ পর্যন্ত তাকে আইনের মুখোমুখি হতে বাধ্য করেছে। তার এই উত্থান-পতনের কাহিনী বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক রাজনীতির জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে- তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের সন্তানরা বিনা বেতনে পড়বে

শিক্ষামন্ত্রী জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের সন্তানরা বিনা বেতনে পড়বে

কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে পিটিয়ে হত্যা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে পিটিয়ে হত্যা

বউ নিতে শ্বশুরবাড়ী আসা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ২

বউ নিতে শ্বশুরবাড়ী আসা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ২

সরকারকে আসিফ নজরুলের ধন্যবাদ

সরকারকে আসিফ নজরুলের ধন্যবাদ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App