×

জাতীয়

দেশে ৫ মাসে ১০৩৫ নারী-শিশু সহিংসতার শিকার

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

দেশে ৫ মাসে ১০৩৫ নারী-শিশু সহিংসতার শিকার

ছবি: সংগৃহীত

দেশে নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের নানা সাফল্যের গল্পের আড়ালে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে সহিংসতার অন্ধকার। 

চলতি বছরের মাত্র পাঁচ মাসেই ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ২৫০ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৬৫ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে ২৩৭ জন নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং আত্মহত্যা করেছেন ৬০ জন। 

ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, সাইবার বুলিং ও প্রযুক্তিনির্ভর নিপীড়নের পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারী-শিশুদের জীবনকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, বরং দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যা অনেককেই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৭ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় জীবনসঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

বিবাহিত নারীদের প্রায় অর্ধেক শারীরিক সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, মাদকাসক্তি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

শনিবার (১৩ জুন) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র, বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক সংকট এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন সরকারের নীতিনির্ধারক, সাবেক বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নারী অধিকারকর্মীরা।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে লিখিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, ‘নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সচেতনতার অভাব সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নারী ও শিশুর অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও বেশি ক্লাব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার সমস্যা সমাজের গভীরে প্রোথিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং মাদক নির্মূল জরুরি।’

তিনি জানান, ‘বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ ল্যাব স্থাপন এবং দেশের ৩৭টি মেডিকেল কলেজে ও পরবর্তীতে প্রতিটি জেলায় ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।’

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, ‘সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার কারণে সেই অধিকার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘শিশুর জন্মের পর থেকেই নানা ধরনের বৈষম্যের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে সহিংস মানসিকতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘নারীর অধিকার খর্ব করার ক্ষেত্রে এখনো ধর্মকে ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। তিনি সাইবার বুলিং ও অনলাইন সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কনটেন্ট নির্মাতা, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে নারী নির্যাতনবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাং, সামাজিক অবক্ষয় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার সমাজে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নয়, সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমেও এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।’

উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোছা. লিজা বেগম বলেন, ‘সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভিকটিম-কেন্দ্রিক পুলিশিং জোরদার এবং প্রতিটি জেলায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।’

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজে কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র এককভাবে এ সমস্যা সমাধান করতে পারবে না; এজন্য সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সংশোধনের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সহিংসতার জন্য কেবল ভুক্তভোগীকে দায়ী না করে অপরাধীর সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহজাবিন হক বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও মাদকাসক্তির পাশাপাশি শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা মানুষের আচরণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সহিংসতা প্রতিরোধে মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।’

বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, ‘নারী নির্যাতন নিয়ে আলোচনায় প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে।’

তিনি বলেন, ‘মাদক ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। পারিবারিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সহিংসতা কমানো সম্ভব বলে তিনি মত দেন।’

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কোষাধ্যক্ষ মেইনথিন প্রমীলা বলেন, ‘সমাজের প্রান্তিক ও আদিবাসী নারীরা বহুমাত্রিক বৈষম্যের শিকার। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।’

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘দেশ বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে।’

তিনি বলেন, ‘শিশু ও নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধপ্রবণ রাজনীতি এবং সামাজিক অবক্ষয় দূর করতে ধারাবাহিক আন্দোলন ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে অধস্তন অবস্থানে রেখে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করছে।’

গত পাঁচ মাসে প্রায় এক হাজার নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি বিচারহীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার গভীর সংকেত বহন করে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধকে শুধু নারী আন্দোলনের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান এই নারী নেত্রী।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভাইকে দেখতে গিয়ে প্রাণ গেল বোনের

ভাইকে দেখতে গিয়ে প্রাণ গেল বোনের

লাকসামে আওয়ামী লীগের ১৬ কর্মী গ্রেপ্তার

লাকসামে আওয়ামী লীগের ১৬ কর্মী গ্রেপ্তার

ফের ওমান উপকূলে ট্যাংকার জাহাজে হামলা

ফের ওমান উপকূলে ট্যাংকার জাহাজে হামলা

মাগুরা জেলা জামায়াতের আমির এম বি বাকেরকে অব্যাহতি

মাগুরা জেলা জামায়াতের আমির এম বি বাকেরকে অব্যাহতি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App