×

জাতীয়

ফিরে দেখা সেই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

ফিরে দেখা সেই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান

ছবি : সংগৃহীত

ফিরে এলো ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর রাজপথ থেকে জেলা-উপজেলা- বাংলাদেশজুড়ে গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।

এই সময় আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মহল এসব ঘটনার তদন্ত এবং জবাবদিহির দাবি জানায়।

আন্দোলনের স্মৃতি ও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অন্তর্বর্তী সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং জুলাই আন্দোলনের অংশীজনরা মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চালু ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ অনগ্রসর জেলার বাসিন্দা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান। পরে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোটা বাতিলসংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে।

পরবর্তীতে ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন। সেই রিটের রায়ে ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনের ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ওই রায়ের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করলে শুনানির জন্য ৪ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ঈদের ছুটির কারণে ১০ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আন্দোলনে বিরতি দেওয়া হলেও আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পর ১ জুলাই থেকে পুনরায় আন্দোলন শুরু হয়।

জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

১ জুলাই : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

২ জুলাই : শাহবাগ অবরোধ করে কোটা সংস্কারের দাবিতে গণপদযাত্রা ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

৩ জুলাই : বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শাহবাগে অবস্থান নিয়ে চার দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলো ছিল-

১. ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র বহাল রাখা।

২. অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা (প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত কোটা ব্যতীত)।

৩. একই ব্যক্তি একাধিকবার কোটা সুবিধা ব্যবহার করতে না পারা এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না থাকলে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দেওয়া।

৪. দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন নিশ্চিত করা।

৪ জুলাই : আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এরপর সারাদেশে নতুন করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে।

৫ জুলাই : অনলাইন ও অফলাইনে জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হয়।

৬ জুলাই : ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই দিনে বিএনপি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।

৭ জুলাই : সারাদেশে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করা হয়।

৮ জুলাই : আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৬৫ সদস্যের সমন্বয় টিম গঠন করা হয়। ঢাকার ১১টি স্থান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, রেলপথ ও মহাসড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।

৯ জুলাই : হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়। আন্দোলনকারীরা পরদিন আবারও ‘বাংলা ব্লকেড’-এর ঘোষণা দেন।

১০ জুলাই : সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালিত হয়।

১১ জুলাই : শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রথমবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩০ জন আহত হন। একই দিনে ছাত্রদল আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানায়।

১২ জুলাই : দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

১৩ জুলাই : ৬৪ জেলায় প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা আসে। একই দিন শাহবাগ থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়।

১৪ জুলাই : গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বিষয়ে বক্তব্য দেন। ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।

১৫ জুলাই : আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরদিন দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

১৬ জুলাই : রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। একই দিনে চট্টগ্রামে সংঘর্ষে আরও দুজন নিহত হন। আন্দোলন নতুন মোড় নেয়।

১৭ জুলাই : বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। রাতে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই রাতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়।

১৮ জুলাই : সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হয়। জাতিসংঘ শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানায়।

১৯ জুলাই : রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাপক সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। রাতে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই দিন আন্দোলনের পক্ষ থেকে ৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

২০ জুলাই : ঢাকাসহ সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

২১ জুলাই : সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সরকারি চাকরিতে নতুন কোটা কাঠামো নির্ধারণ করা হয়-৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক, ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য, ১ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য।

২২ জুলাই : আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন প্রজ্ঞাপন অনুমোদন দেওয়া হয়।

২৩ জুলাই : কোটা সংস্কারসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

২৬ জুলাই : দেশজুড়ে ব্লক রেইড ও অভিযান পরিচালনা করা হয়। বহু মামলা দায়ের হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।

২৭ জুলাই : আরো দুই সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।

২৮ জুলাই : সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ক ভিডিও বার্তায় কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। একই দিনে ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়।

২৯ জুলাই : ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩০ জুলাই : ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

৩১ জুলাই : ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

১ আগস্ট : ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ককে মুক্তি দেওয়া হয়। একই দিনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

২ আগস্ট : জুমার নামাজের পর ২৮ জেলায় ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ অনুষ্ঠিত হয়।

৩ আগস্ট : সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজধানীসহ দেশের ৩৩ জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

৪ আগস্ট : সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিনে দেশের অন্তত ১৮ জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

৫ আগস্ট : টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে জনতার প্রবেশ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন, সহিংসতা, প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সময় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেবুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগরে লঘুচাপের শঙ্কা

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগরে লঘুচাপের শঙ্কা

পেছন থেকে হঠাৎ গুলি, সড়কেই মৃত্যু হলো যুবকের

পেছন থেকে হঠাৎ গুলি, সড়কেই মৃত্যু হলো যুবকের

খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরান যাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরান যাচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

যে কারণে একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন ভিনিসিয়ুস

যে কারণে একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন ভিনিসিয়ুস

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App