শাহাদাৎ বার্ষিকী
মানবতা-সাহস-আত্মত্যাগের প্রতীক ‘মুগ্ধ’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আজ ১৮ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের শাহাদাৎ বার্ষিকী। ২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার পানি ও বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। তার শেষ উচ্চারণ “পানি লাগবে? কারও পানি লাগবে?” আজও মানবতা, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং মা শাহানা চৌধুরী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধের যমজ ভাই।
শিক্ষাজীবনে মুগ্ধ ২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এ ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্বও পালন করতেন। মৃত্যুর আগে তিনি এক হাজারের বেশি ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প সম্পন্ন করেছিলেন।
মুগ্ধ বাংলাদেশ স্কাউটসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর বনানীর অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় সেবাপদকও অর্জন করেন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে উত্তরা আজমপুরে আন্দোলনকারীদের হাতে পানি ও বিস্কুট তুলে দিচ্ছিলেন মুগ্ধ। সে সময় তাকে বলতে শোনা যায়, “পানি লাগবে? কারও পানি লাগবে?” কিছুক্ষণ পরই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদের মৃত্যুতে গড়া জুলাই ঐক্য কেন টিকলো না?
তার মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে ধারণ করা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। “পানি লাগবে?” এই সংক্ষিপ্ত আহ্বান পরিণত হয় মানবিকতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীকে। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালচিত্র, স্মারক এবং নিরাপদ পানির কর্নার স্থাপনের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা হয়।
মৃত্যুর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বায়োতে মুগ্ধ লিখেছিলেন, “একদিন তুমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, তাই এমন জীবন গড়ে তোলো, যা মানুষ আজীবন মনে রাখবে।”
স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে, এই কথাগুলো তার জীবন ও আত্মত্যাগের সঙ্গেই যেন মিলে গেছে।
মুগ্ধের মৃত্যুর দুই বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তার যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং দ্রুত বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি।
তার ভাষ্য, শুধু বিচারই নয়, যে আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিল, সেই বাংলাদেশ গঠনের কাজও এখনো অসম্পূর্ণ। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় শহীদ পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলায় খালাস চেয়ে ৪ আসামির আপিল
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মুগ্ধ ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে প্রাণবন্ত মানুষ। ঈদসহ যেকোনো পারিবারিক আয়োজন তার উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর প্রতিটি উৎসবই পরিবারের কাছে বেদনার দিনে পরিণত হয়েছে। স্বজনদের দাবি, সময় পেরিয়ে গেলেও তার শূন্যতা পূরণ হয়নি।
মুগ্ধের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ মীর মুগ্ধ তোরণ’। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
আজ ১৮ জুলাই, তার শাহাদাৎ বার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল ও শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। মানবতা, সাহস এবং নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক হিসেবে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ আজও মানুষের হৃদয়ে অমলিন।
