আবু সাঈদের মৃত্যুতে গড়া জুলাই ঐক্য কেন টিকলো না?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
ফাইল ছবি
জুলাই আন্দোলনে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবিই এখন তার মা মনোয়ারা বেগমের একমাত্র স্মৃতি। ছবিটি তিনি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছেন। মাঝেমধ্যে সেটি বের করে আদর করে দেখেন, কাপড় দিয়ে মুছে আবার যত্ন করে রেখে দেন।
বাড়ির পাশেই আবু সাঈদের কবর। প্রায় প্রতিদিন সেখানে গিয়ে ছেলের জন্য দোয়া করেন বাবা মকবুল হোসেন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। ছেলে বেঁচে থাকলে তার জীবন কেমন হতে পারত— সেই হিসাবই যেন এখনও করেন তিনি।
মকবুল হোসেন বলেন, “ছেলে হারানোর যে কষ্ট, আমার আত্মাটা এতদিনেও ঠাণ্ডা হইলো না। হয়তো সে সামনে ঘোরাঘুরি করতো, চাকরি করতো, বিয়ে-শাদি করতো, বাড়ি-ঘর করতো। আমার সামনে থাকতো। এগুলো তো কিছু হলো না”।
আরো পড়ুন: আবু সাঈদ জুলাই শহীদদের ইমাম, জুলাই বিপ্লবের রূহানী নেতৃত্ব
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
অনেকের মতেই তার মৃত্যু তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু ৫ অগাস্টের পর সেই ঐক্য আর থাকেনি, সেখানে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় বিভক্তি। আন্দোলনের ক্রেডিট, নির্বাচন, সংস্কার প্রশ্নে বদলে যায় ঐক্যের বাস্তবতা।
চব্বিশের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সারাদেশে বেগবান হচ্ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ছিলো।
আওয়ামী লীগের তৎকালীন সরকার একপর্যায়ে এই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পুলিশ প্রশাসন তো বটেই, বিভিন্ন স্থানে মারমুখী হয়ে ওঠে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষও হতে থাকে।
এরই একপর্যায়ে ১৬ই জুলাই রংপরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন।
সেসময় ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যাচ্ছিলো, আবু সাঈদের দিকে গুলি ছুড়ছেন পুলিশ সদস্যরা। অন্যদিকে পুলিশের সামনে দুই হাত দু'দিকে প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন আবু সাঈদ।
গুলির মুখে তার দাঁড়ানোর এই দৃশ্য এবং পরে তার মৃত্যু আন্দোলনে নাটকীয় পরিবর্তন আনে। তার ছবি ও ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোড়ন তোলে।
লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ওই মুহূর্তটাই হয়ে ওঠে "আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট"। তখনকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, আবু সাঈদের মৃত্যু দুটি বিষয় ঘটিয়েছে।
এক. আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও সব দল-মতের ঐক্য তৈরি করেছে।
দুই. আন্দোলনে গতি এনে সেটাকে সরকার পতন আন্দোলনের দিকে নিয়ে গেছে।
"এ ধরনের আন্দোলনে যদি কেউ নিহত হয়, তখন আন্দোলন বেগবান হয়। এটা ঊনসত্তরে আমরা দেখেছি আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। নব্বইয়ে দেখেছি যখন ডাক্তার মিলনকে মেরে ফেললো তখন এই আন্দোলনে আর পিছু হটার সিচুয়েশেন ছিল না। এখানে আবু সাঈদের মৃত্যুটাও আন্দোলনে সঞ্জীবনী শক্তির মতো কাজ করেছে," বলেন তিনি।
পরবর্তী দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যোগ দেন।
"আওয়ামী লীগ, তার সমর্থক এবং আওয়ামী লীগের কোলাবরেটর যারা, তারা বাদ দিয়ে বাকি সবার মধ্যে আমরা একটা ঐকবদ্ধ অবস্থান দেখলাম। এটা হয়ে গেলো 'হাসিনা হটাও' আন্দোলন। আবু সাঈদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই এটা শুরু," যুক্ত করেন মহিউদ্দিন আহমদ।
আন্দোলনের ঐক্য পরে হোঁচট খেলো কোথায়?
জুলাইয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন এবং তার দেশ ছেড়ে পালানোর পর বাংলাদেশে নতুন আরেক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সেটা হচ্ছে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনায় বিশাল এক শূন্যতা।
জুলাইয়ে গড়ে ওঠা ঐক্য প্রথম হোঁচট খায় এই শূন্যতা কীভাবে এবং কারা পূরণ করবে সেটাকে ঘিরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলেন, তখন কে, কী সুবিধা নেবে সেই হিসেব-নিকেশ শুরু হয়।
"একেবারে ইউনিয়ন লেভেল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের টপ পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতা যেভাবে বিলি-বণ্টন হয়, সেই বিলি-বণ্টনের পুরো ব্যবস্থাটা হঠাৎ করে ভ্যানিশ (অদৃশ্য) হয়ে যায়। এরকম একটা পতনের পরে এই পুরো স্ট্রাকচারের জায়গাগুলোতে নতুন কেউ আসার জন্য একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়," তিনি বলেন।
আরো পড়ুন: জীবন দেব, তবু ‘চব্বিশকে’ হারিয়ে যেতে দেব না: জামায়াত আমির
এই প্রতিযোগিতায় সক্রিয় হয়ে ওঠে মূলত রাজনৈতিক শক্তিগুলো। এরসঙ্গে যুক্ত হয় অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারাও।
লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, "বড় দল হিসেবে এখানে বিএনপি একটা পক্ষ ছিল। আবার ওই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর একটা বড় রকমের পুনরুত্থান হলো। তারাও একটা পক্ষ। আবার যারা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন, তারাও একটা পক্ষ হয়ে গেলেন, নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকলেন।"

তিনি বলেন, "দেখা গেলো, কেউ সচিবালয়ে নিজের লোক বসাচ্ছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের লোক বসাচ্ছে। সেখানে একধরনের প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বৈরথ তৈরি হলো।"
জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতে এবং এর কেন্দ্র ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো, যার শুরুটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু এই আন্দোলন পরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো আন্দোলনে অংশ নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করে। তবে শুরুতে তারা সেভাবে সামনে আসেনি। বরং নেপথ্যে থেকেই কাজ করেছে।
কিন্তু পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক শত্তিগুলো সামনে চলে আসে এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে আন্দোলনের ক্রেডিট কার সেটা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা মনে করেন, মূলত আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন এবং শক্তি না থাকাতেই যাদের সেটা ছিল সেই রাজনৈতিক দলগুলো সামনে চলে আসে।
"যারা (নেতৃত্বের) সামনে ছিল তাদের প্রস্তুতি ছিল না। তাদের রাজনৈতিক দল ছিল না। কিন্তু যাদের রাজনৈতিক দল ছিল, তারা সেটার ক্রেডিট দাবি করলেন। কারণ তারা বললেন যে, তারা পেছনে ছিলেন, তাদের নানাধরনের সমর্থন এখানে ছিল। তো এসব দাবি, সেগুলো নানাভাবেই ঐক্য নষ্ট করেছে। ...এখানে মাস্টারমাইন্ড ঘোষণাও আমরা দেখেছি," বলেন তিনি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সেসময় সব পক্ষ বিশেষকরে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়েই বিভক্তি?
শুরুর দিকে ক্রেডিট ভাগাভাগি নিয়ে যে দ্বন্দ্ব, সেখানেই সবকিছু আটকে থাকেনি। পরবর্তীকালে পরিস্থিতি আরো তিক্ত হয়ে ওঠে।
একদিকে নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বিরোধ, অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নেয় সংস্কারের নানা অ্যাজেন্ডা।
সেসময় প্রধান দুটি ইস্যু নির্বাচন এবং সংস্কার- দুটো নিয়েই নানাভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে দলগুলো।
কিন্তু এই যে সবকিছু নিয়েই বিভক্তি তার মূলে আসলে কী ছিল?
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, "ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারাই ছিল এখানে মুখ্য।"
অন্যদিকে সামিনা লুৎফাও একই মত দেন।
তিনি বলেন, "কে দ্রুত ক্ষমতায় যাবে, কোন প্রসেসে যাবে সেটাই ছিল মূল বিষয়। সেটাকে কেন্দ্র করেই তারা যা কিছু করার, করেছেন। কেউ একজন সংস্কার সংস্কার করছে, কিন্তু আসলে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন সংস্কার, যেটা দিয়ে সে আগে ক্ষমতায় পৌছাতে পারবে।"
"আপনি চিন্তা করেন, বিএনপির মতো দলকে বলতে হয়েছে যে, আমরা তখন চাপে পড়ে এইটাতে (সংস্কারে) রাজি হয়েছি। কারণ তা না হলে নির্বাচন পিছিয়ে যাবে। মানে সবগুলো রাজনৈতিক দলেরই এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল আমি কীভাবে ক্ষমতায় যাবো," বলেন সামিনা লুৎফা।
দলগুলো একদিকে বিভক্ত হয়েছে, অন্যদিকে এই বিভক্তি ছড়িয়েছে অভ্যুত্থানের সমর্থকসহ সমাজেরও বিভিন্ন স্তরে। পরে ২০২৬ সালে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও সেটার আর কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি।
কিন্তু এর ফল কী? মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, এরফলে জনগণের মধ্যে 'বিভ্রান্তি বাড়ছে''।
তিনি বলেন, "এখন একটা ধারণা হয়েছে যে মানুষ আবারো প্রতারিত হচ্ছে। মানুষ একবার বাহাত্তর সালে প্রতারিত হয়েছে, নব্বইয়ে প্রতারিত হয়েছে এবং এবারও এ ধারণাটা জেঁকে বসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে যে, তাহলে কেন আমরা বারবার আন্দোলন করি। তখনই অনেকে বলতে শুরু করেছেন যে, আগেই তো আমরা ভালো ছিলাম।”
সূত্র: বিবিসি।
