টিআইবি
সংসদে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতার একচ্ছত্র অপব্যবহার’ হচ্ছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালী বিধি এবং প্রচলিত সংসদীয় রীতি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব ব্যবহার করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সংসদীয় জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক বিবৃতিতে এসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরে টিআইবি।
বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ৭৭ অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী বিল উত্থাপনের পর তা স্থায়ী কমিটি, বাছাই কমিটি কিংবা জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। তবে প্রচলিত সংসদীয় চর্চায় অধিকাংশ বিল স্থায়ী কমিটিতে গেলেও ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়নি। পাশাপাশি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও সীমিত ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি পৌঁছানোর আগে কোনো মন্ত্রী বিল-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন না। প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী বিলের কপি অন্তত তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের কাছে সরবরাহ করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিলের অনুলিপি উত্থাপনের ঠিক আগে বিতরণ করা হয়। এতে সদস্যদের বিলটি পর্যালোচনার বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি হয়নি এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই আইনটি পাস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিরোধী দলের আপত্তি ও মতামত উপেক্ষা করে আরও কয়েকটি বিল দ্রুত পাস করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়ায় আইন পাস হওয়ায় আইন প্রণয়নের সাংবিধানিক ও সংসদীয় চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে অতীতের কর্তৃত্ববাদী সংসদীয় চর্চার পার্থক্য কোথায়।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়েও আপত্তি জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ অনুযায়ী কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ন হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তার ভাষায়, একজন মন্ত্রিসভার সদস্য অন্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কতটা স্বাধীনভাবে তদারকি করতে পারবেন, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। নব্বই-পরবর্তী সংসদগুলোতে এমন নজির দেখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ২৪ নম্বর ধারায় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। পাশাপাশি সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদেও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ছিল। সে হিসাবে প্রায় ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি বলে দাবি টিআইবির।
বিবৃতিতে সংস্থাটি ইতোমধ্যে গঠিত বিতর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর পুনর্গঠন, ভবিষ্যতে ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ী কমিটি গঠন এবং সংবিধানের ৭৮(৫) অনুচ্ছেদের আলোকে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে।
এ ছাড়া জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিতে অন্তত একজন করে এবং সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সব নারী সংসদ সদস্যকে অন্তত একটি স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করারও সুপারিশ করেছে টিআইবি।
