×

জাতীয়

ফিরে দেখা ১ আগস্ট ২০২৪

নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ জামায়াত-শিবির

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ জামায়াত-শিবির

ছবি : সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১ আগস্ট ‘৩২ জুলাই’ কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এদিন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ছয় সমন্বয়ককে মুক্তি দেওয়া হয়। একই দিনে সরকার নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পাশাপাশি দেশজুড়ে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালিত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

১ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে কালো রঙের দুটি গাড়িতে করে ডিবি কার্যালয় থেকে ছয় সমন্বয়ককে নিজ নিজ বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কেউ ছয়দিন, কেউ পাঁচদিন এবং কেউ চারদিন ডিবির হেফাজতে ছিলেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বাবা বদরুল ইসলাম জানান, ভোর ৬টার দিকে ডিবি থেকে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে কার্যালয়ে যেতে বলা হয়। পরে দুপুরে ছেলেদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, ডিবি কার্যালয়ে নাহিদসহ কয়েকজন সমন্বয়ক টানা দুই দিন অনশন করেন। দীর্ঘ অনশনের কারণে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল এবং তিনিও প্রায় ৩২ ঘণ্টা অনশন করেছিলেন।

মুক্তির পর সমন্বয়ক সারজিস আলম ছয় সমন্বয়কের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, ‘ছয়দিন ডিবি হেফাজতে আটকে রাখা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আটকানো সম্ভব নয়। যতদিন জুলুম চলবে, ততদিন আন্দোলন চলবে।’ পোস্টটি প্রকাশের কিছু সময় পর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হয়ে যায়।

এর আগে ১৯ জুলাই গভীর রাতে নাহিদ ইসলামকে খিলগাঁও থেকে তুলে নেওয়া হয়। একদিন পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পূর্বাচলে ফেলে রাখা হয়। একইভাবে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও বাকের মজুমদারকেও তুলে নিয়ে কয়েকদিন পর চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে তারা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখান থেকে আবারও তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।

দেশজুড়ে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’

শহীদ ও আহতদের স্মরণে ১ আগস্ট সারা দেশে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিবাদী স্লোগান, গণসংগীত, পথনাটক, দেয়াল লিখন ও চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করা হয়।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং অন্তত ১৬টি জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

তবে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে কর্মসূচি। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং কয়েকটি স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ৯ দফা দাবির সমর্থনে মিছিল বের করা হয়।

এদিকে আওয়ামীপন্থি নীল দল সংবাদ সম্মেলনে জানায়, শিক্ষার্থীদের দাবির অধিকাংশ পূরণ হওয়ায় আন্দোলন থেকে সরে আসার সময় এসেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। অনেক জায়গায় বৃষ্টির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোটা আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিবাদ

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানি, হামলা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা। তারা নিহতদের বিচার দাবি করেন এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানান।

নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২ আগস্ট দেশব্যাপী ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

সমন্বয়ক আব্দুল কাদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জুমার নামাজ শেষে শহীদদের জন্য দোয়া, কবর জিয়ারত, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে প্রার্থনা এবং গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচিতে শ্রমিক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও আলেম-ওলামাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

হতাহতের চিত্র

তৎকালীন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত কোটা আন্দোলনের সহিংসতায় ২১২ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়, যা মোট নিহতের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

এ ছাড়া প্রায় ছয় হাজার ৭০০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ২৩১ জন গুলিবিদ্ধ ছিলেন। অনেকের চোখে ছররা গুলি লাগে এবং কয়েকজনের পা কেটে ফেলতে হয়। তবে বিভিন্ন মহলের দাবি, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি ছিল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করে, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে জানায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তদন্তের আহ্বান

১ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। প্রয়োজনে জাতিসংঘ বা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি সহিংসতার জন্য জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে এবং তদন্ত চলছে। পাশাপাশি দেশের উন্নয়নবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

পরবর্তীতে জাতিসংঘ জানায়, বাংলাদেশ সরকার চাইলে সহিংসতার তদন্তে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। একই সময় ১৬ থেকে ২১ জুলাইয়ের সহিংসতা, প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নাশকতার ঘটনা তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

নির্বাহী আদেশে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ

১ আগস্ট বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং তাদের অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে সংগঠনগুলো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।

তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কোটা আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্যের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের নামে নতুনভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার যেকোনো চেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কারাগারে মায়ের সঙ্গে থাকে ৩০৩ শিশু, সবচেয়ে বেশি কাশিমপুরে

প্রতিবেদন কারাগারে মায়ের সঙ্গে থাকে ৩০৩ শিশু, সবচেয়ে বেশি কাশিমপুরে

হত্যাচেষ্টা মামলা: বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা সাইদুল কারাগারে

হত্যাচেষ্টা মামলা: বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা সাইদুল কারাগারে

ডিবির হাতে ইয়াবাসহ মা ও মেয়ে গ্রেপ্তার

ডিবির হাতে ইয়াবাসহ মা ও মেয়ে গ্রেপ্তার

সরু গলি-পানি স্বল্পতা, বেগ পেতে হচ্ছে চকবাজারে মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে

সরু গলি-পানি স্বল্পতা, বেগ পেতে হচ্ছে চকবাজারে মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App